শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
নকলায় সাড়ে ১০ হাজার পরিবারের মাঝে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি নকলায় হেলথকেয়ার সেন্টারের পক্ষথেকে গাছের চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপন ঝিকরগাছায় বিজ্ঞান স্টার্টআপ,বিজ্ঞান প্রকল্প এবং উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত বিশ্বনাথ উপজেলা ও পৌরসভা জামায়াতের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জের হরিনগরে বাড়ির ছাঁদ থেকে গাঁজার গাছসহ ১ জন আটক প্রয়াত ধামাইল শিল্পী সৃষ্টি চৌধুরীর পুণ্যস্মরণে বৈষ্ণব সেবা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ও পদাবলী কীর্তন অনুষ্ঠিত শেরপুরে সংঘবদ্ধ হামলার স্বীকার সাইফ মারা গেছেন! বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে শেরপুরে আলোচনা ও পরিকল্পনা সভা হাওরকন্যা ইমার জয়যাত্রা: দেশের পতাকা বুকে নিয়ে একের পর এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে জেলার শ্রেষ্ঠ নকলার ইউএনওকে বিভিন্ন মহলের পক্ষে ফুলেল শুভেচ্ছা

নরসিংদী ও সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার মিল ও অমিল ◑ শেখ একেএম জাকারিয়া

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫১১ বার পড়া হয়েছে
৪২৩

◑ শেখ একেএম জাকারিয়া

বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক যোগাযোগ, সামাজিক রীতি ও সংস্কৃতির প্রভাবে একই ভাষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ গড়ে উঠেছে। নরসিংদী ও সুনামগঞ্জ জেলা দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত হলেও তাদের ভাষায় বিস্ময়কর মিল ও পার্থক্য বিদ্যমান। এই প্রবন্ধে নরসিংদী ও সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার ধ্বনিগত ও শব্দার্থিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অনেক শব্দে ধ্বনি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন, শুদ্ধ “কাদা” শব্দটি নরসিংদীতে “ফেক”, আর সুনামগঞ্জে “ফেখ”। আবার “ড” ধ্বনি অনেক ক্ষেত্রে “দ/ত” ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন, “ডিম”-এর পরিবর্তে “বইদা” বা “এণ্ডা” ব্যবহৃত হয়। একইভাবে স্বরবর্ণ সংক্ষেপণও দেখা যায়। যেমন, “একবারে” উচ্চারণ হয় “অক্করে” বা “এখবারে”।

শব্দার্থিক দিক থেকেও মিল ও অমিল রয়েছে। অনেক শব্দ উভয় অঞ্চলে প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, “মাইনসে” মানে মানুষ। তবে কিছু শব্দের ক্ষেত্রে অর্থে ভিন্নতা পাওয়া যায়। যেমন, “ছেরি” নরসিংদীতে মেয়ে বোঝালেও সুনামগঞ্জে ঝি বা ফুরি বোঝায়।

নরসিংদী ও সুনামগঞ্জে অভিন্ন অনেক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন, মাইনসে (মানুষ), নুন (লবণ), কাইজ্জা (ঝগড়া), হাছা (সত্যি), রাইত (রাত)। আবার কিছু শব্দ রূপভেদে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, আগামীকাল নরসিংদীতে “কালআ” এবং সুনামগঞ্জে “কালকে/কাইল”। পুকুর উভয় অঞ্চলে “পুসকুনি/পুস্কুনি” বলা হয়, তবে উচ্চারণে টান ভিন্ন। নরসিংদীতে “টমেটো” বলা হয় “চুক্কা বাইগন”, আর সুনামগঞ্জে “ভেট বাইঙ্গন” বা সরাসরি “টমেটো”। ডিম নরসিংদীতে “বইদা”, সুনামগঞ্জে “এণ্ডা” বা “বইদা”। বাচ্চাকে নরসিংদীতে বলা হয় “পুলাফান” বা “আবুইদ্দা”, আর সুনামগঞ্জে “ফুরুত্তা” বা “পোলাফাইন”।

অন্যদিকে, কিছু শব্দ ভিন্নার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, পেয়ারা নরসিংদীতে “হুরপি/গৈয়ম”, সুনামগঞ্জে “সফরি”। লেবু নরসিংদীতে “লিম্বু”, সুনামগঞ্জে “লেম্বু/জামির”। শিম নরসিংদীতে “চই”, আর সুনামগঞ্জে “উরি”। ঝাড়ু নরসিংদীতে “ঝাডা/হাছুন”, সুনামগঞ্জে “ফুড়ুন” নামে পরিচিত।
উভয় অঞ্চলের ভাষায় মিলও রয়েছে। উভয় জায়গার মানুষ ছোট করে উচ্চারণ করতে পছন্দ করে (যেমন: “অক্করে”, “এখবারে”)। অনেক শব্দ অভিন্ন বা প্রায় অভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয় (যেমন: “মাইনসে”, “কাইজ্জা”, “হাছা”)। বিশেষ করে খাবার, পারিবারিক জীবন ও দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পর্কিত শব্দভাণ্ডারে মিল বেশি। তবে পার্থক্যও কম নয়। ফলমূল, মাছ, সবজি ও স্থানীয় খাবারের নামকরণে পার্থক্য সবচেয়ে বেশি। ধ্বনিগত দিক থেকে নরসিংদীতে অনেক শব্দে “চ” ধ্বনি ব্যবহৃত হলেও সুনামগঞ্জে তা “ফ/খ” ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন, “চুক্কা” শব্দটি সুনামগঞ্জে উচ্চারিত হয় “ফুক্কা/হুক্কা” ধাঁচে। পারিবারিক সম্বোধনেও ভিন্নতা স্পষ্ট। যেমন, মেয়ে নরসিংদীতে “ছেরি/মাইয়া”, আর সুনামগঞ্জে “ঝি/ফুরি”।

ভাষাগত পার্থক্যের কারণও বহুমুখী। নরসিংদী   মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত,  সুনামগঞ্জ উত্তর-পূর্ব সীমান্তে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবনধারার ভিন্নতা ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ ভারতের মেঘালয়ের কাছাকাছি  হওয়ায় পাহাড়ি ভাষার প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে নরসিংদী ঢাকার নিকটে হওয়ায় রাজধানীমুখী ভাষার প্রভাব স্পষ্ট। তাছাড়া হাওর অঞ্চলের মানুষ ও ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা তীরবর্তী মানুষের সামাজিক যোগাযোগও ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি আরও একটি বিশেষ কারণ হলো জনবসতির স্থানান্তর। বিংশ শতাব্দীতে প্রচুর মানুষ দলবদ্ধভাবে নরসিংদী থেকে সুনামগঞ্জে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তাদের আদি ভাষার সাথে সুনামগঞ্জের স্থানীয় বসতিদের ভাষার মিশ্রণ ঘটায় উভয় অঞ্চলের ভাষায় অভিন্নতা ও মিল লক্ষ্য করা যায়।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, নরসিংদী ও সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা পরস্পরের কাছাকাছি হলেও উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা বিদ্যমান। একদিকে “মাইনসে”, “কাইজ্জা”, “নুন” প্রভৃতি শব্দে মিল পাওয়া যায়, অন্যদিকে “পেয়ারা”, “টমেটো”, “বাচ্চা” প্রভৃতি শব্দে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এই মিল ও অমিল বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আঞ্চলিক ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

 

পরিশিষ্ট : নরসিংদী ও সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক শব্দতালিকা
শুদ্ধ শব্দ—নরসিংদী আঞ্চলিক—সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক

আগামীকাল—কালআ—কালকে, কাইল, কালকু
মিথ্যা—মিছা—মিছা
গোসল—গতরধোয়া, গুছুল, বুরপারা— বুরপারা, গাওধোয়া
পুকুর — পুসকুনি/পুসকুনি — পুসকুনি, তালাব
তাড়াতাড়ি — হাবলাইয়া, তাগদা— চালাককরি, তাগদা
পেয়ারা—হুরপি/গৈয়ম—সফরি
কাদা—ফেক—ফেখ
টক—চুক্কা—চুক্কা, চুকা
কলস—টিল্লা—কইলা
বিশ্রাম—জিরানি—জিরানি, জিরাও
শিম—চই—উরি
লবণ—নুন—নুন
টাকা—টেহা—টেখা
বস্তা—ছেলা—ছলা
টমেটো—চুক্কাবাইগন — ভেটবাইঙ্গন, টমেটো
ব্যথা পাইছি — দুকপাইছি — দুকপাইছি
এইদিকে—এমেদা—এমদি
ঐদিকে — ওমেদা — ওমদি
সেইদিকে — হেমেদা—হেমদি, হেমেদি
মোটা — বটকা, বুইত্তা — বটকা, মটকা, মোডা
খেয়েছি—হাইছি—খাইছি
তর্ক করা — চুপাকরা— ছুপাকরা
ছিদ্র—হুরুল—ফের, কুরুল
কান্না—চিল্লানি— চিল্লানি
ঝগড়া — কাইজ্জা — কাইজ্জা, মাইর
সকাল—বিন্নালা—বিয়াইন্নাবালা, বিয়ানতিবালা
তরকারি—ছান—ছালুন
পাতিল—ডেগ—ডেগ
বাচ্চা—পুলাফান, আবুইদ্দা—ফুরুত্তা, পোলাফাইন
চুলা—পাহাল—উন্দাল
বাথরুম—লেফটিন— টাট্টি, পায়খানা, লেফটিন
বাসস্ট্যান্ড —বাসটিন—বাসটেন
ছেলে —ছেরা—পোয়া, পুত
মেয়ে —ছেরি, মাইয়া—ফুরি, ঝি
ঝাড়ু — ঝাডা, হাছুন — ফুড়ুন
কে —কেডা — কেলা, কেগু
ডিম — বইদা — এণ্ডা, বোইদা/ বইদা
দাঁড়াও— কাড়াও— উবাও, কাড়াও
মানুষ—মাইনসে— মাইনসে
পুরুষ —বেডা—বেটা, বেডা
মহিলা —বেডি —বেটি, বেডি
তারপর —তারপা —তাফরা
বলব—কইয়াম—কইমু
কলা— কলা — কলা
বাসর — বাওর — বাসর, কালরাইত
দেবর — দেওর —দেওর
স্বমদ্ধি — বরগিরি — স্বমদ্ধি, বরগিরি
সালা — হালা — হালা
বসুন — বোইন — বইন
গরম — ততা — গরম
হৈচৈ — ওমালি — উমাইল
একবারে — অক্করে — এখবারে
রবিবার — লোববার — রববার
তিনি — ইলা — ইলা, ইগু
সে — হিলা — হিলা, হিগু
ও মা —উম্মা— ও মা
সকাল বেলা — বেইন্যালা — বেইন্যাবালা, বেয়ান্তিবালা
বিকাল — বাই-ট্রালা — বিয়াল
সন্ধ্যা — হাইঞ্জালা — হাইঞ্জা-বালা, হাইঞ্জা-কালা
রিকশা — লিক্সা — রিসকা
হেঁটে — আইট্রা — আইট্টা
গর্ত — গাতা — গাতা, ফের
কৃপণ — কিরপিন — কিরফন
লুঙ্গি — তবন — তফন
অনেকগুলি — লাইজ্জারতা — লাইজ্জরতা, অনেকতা
আমরা—আমডা— আমরা
রসুন — নুহোন —রসুন
লেবু—লিম্বু — লেম্বু, জামির
ঢাকা— ঢাহা—ঢাখা
প্রস্রাব—মুত —মুত
পায়খানা — আগা — আগা
বাইরে — বাইরে — বাইরে
সেদিন — হিদিনকা — হিদিন
বুধবার — বুইদবার — বুধবার
শুক্রবার — শুক্কুর-বার — শুক্কুরবার
শ্বশুর — হওর — হউর
শাশুড়ি —শাশ —হওরি
মিষ্টি আলু —লাম্বা-আলু — লাম্বাআলু
বোকা — বেক্কেল — বেক্কল
সরিষা — হওড়া — হইরো
শিং মাছ — হিংমাছ — হিঙ্গিমাছ
ডাটা — ডেংগা — ঢুগি, ডেংগা
মুলা — মোল্লা — মুলা
পাখা — বিছুন, পাংখা—পাখা
সুপারিশ —বেগালতা — বেগারতা
স্টেশন— ইস্টিশিন— ইষ্টিশন
টেংরা মাছ—বজজা মাছ— টেংরামাছ
শুকানো—হুগাইয়া —ফুকিয়ে, ফুকানো
দাঁড়াও —খাড়ও—খাড়াও, উবাও
শুঁটকি —হুটকি— হুকুন, ফুকুন
লজ্জা—শরম —শরম
এখন —অক্কনে—অখন
একটু —কুদ্দুরা—এখটুক
কথা—লাও—মাত, রাও
সবকিছু—হগলতে— হগলতা, সখলতা, হখলতা
জন্য—লাইগ্যা—লাগি
আমরা— আঙ্গ— আমরা
গ্রামে — গে-রামে — গাওত
প্রাইমারী— ফাইমারী— ফাইমারী
ছোট—ছুডু —ফুরু
বড়—বুইত্তামারা—বড়
নিকটে—লগেদা—কান্দাত
আমাদের—আঙ্গ —আমরার
মেয়ে-ছেলে—মাইয়া-ফোলা—পুয়া-ফুরি
পড়ালেখা — ফরালেহা— ফড়ালেখা
সাপ —হাফ —হাফ
পুত্র—পোলা— পুত, পোয়া

লেখক: কবি,গবেষক ও প্রাবন্ধিক। 

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102