সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:২৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
ঈদুল আযহার তৃতীয় দিনেও ব্রিটিশ চান্দশির কাপন ট্রাস্ট ইউ কের পক্ষ থেকে কোরবানি মাংস বিতরণ সম্পন্ন। বিশ্বনাথে সাংবাদিকদের সাথে মেয়র প্রার্থী মুজিব আহমদ মনিরের মতবিনিময়। শাহেদ আলী’র ‘জীবনকথা’: একটি পর্যালোচনা দরগাপাশা ইউনিয়ন যুবদল’র সভাপতি ছালিক আহমদ’র ঈদ বার্তা ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক জীবন: আওরাবুনিয়াবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানালেন শামসুল হক সুমন পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা বার্তা ঈদুল আজহা উপলক্ষে জামালগঞ্জে পশু জবাই ও চামড়া সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ সভা ঈদের বাস্তবতা ও আমাদের চরিত্র নকলায় উপজেলা এনজিও কমিটির মাসিক সমন্বয় সভা নকলায় গ্রাম আদালত সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্মশালা

রহমত নগর থেকে রহমতপুর : নাম ও ইতিহাসের গল্প ☞ শেখ একেএম জাকারিয়া

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৭০৮ বার পড়া হয়েছে
৪৭৬

☞ শেখ একেএম জাকারিয়া

স্মৃতির আয়নায় ভেসে আসে একটি নাম, রহমতপুর। একটি নাম, যার অন্তরালে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও এক মানুষকে ঘিরে জনশ্রুতি। আজ থেকে প্রায় ২৩৫ বছর আগে, লক্ষ্মণশ্রী পরগণার শান্ত প্রান্তরে বসতি স্থাপন করেছিলেন এক পরহেজগার, সদয় ও দূরদর্শী মানুষ, রহমত আলী।

ধর্মচর্চা, দয়া ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ১৭৯০ সালে, ব্রিটিশ আমলের দশসনা বন্দোবস্তের সময় তিনি ‘দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও’ নামে একটি মৌজার বন্দোবস্ত গ্রহণ করেন। সেই বন্দোবস্ত দলিলে তাঁর নামের শেষে লেখা ছিল ‘তাং’। এটি ছিল শুধু একটি উপাধি নয়, বরং তৎকালীন সমাজে সামাজিক মর্যাদা, নেতৃত্ব ও সম্পত্তির স্বীকৃতি।

ঐতিহাসিক নথি ও পারিবারিক সূত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, রহমত আলী তাং শুধু বন্দোবস্তের সময়ে নয়, বরং তারও আগে থেকেই তালুকদারি মর্যাদা বহন করতেন। তাঁর সাহস, প্রজ্ঞা ও জনহিতৈষী মানসিকতার স্মরণে, কালক্রমে তাঁর বসতভূমি পরিচিতি পায় ‘রহমতপুর’ নামে।

এই জনপদের প্রতিটি মাটি, বৃক্ষ ও পথ যেন আজও ধারণ করে রেখেছে সেই রহমত আলীর স্মৃতি। কালের স্রোতে বিলীন হয়নি যাঁর ছায়া; বরং একক মানুষের পদক্ষেপে নির্মিত হয়েছে এক মৌজা বা জনপদের নাম-রহমতপুর।

জানিগাঁও নিবাসী শ্রীযুক্ত নভো বকস তালুকদারের পৌত্র এবং শ্রীযুক্ত খছির তালুকদারের পুত্র সিকন্দর আলী (বয়স ৯০) বলেন:
“আমার দাদাজান ও নানাজান উভয়েরই নাম ছিল একই। (তথ্য সংগ্রহ: ২০১১ সাল) দাদার নাম ছিল নভো বকস তালুকদার, আর নানার নাম নভো মড়ল। মায়ের নাম হাজেরা বেগম। আমার দাদা, শ্রীযুক্ত নভো বকস তালুকদার, বারো আনা তালুকদারি অধিকারী ছিলেন। আর মাত্র চার আনা হলে তিনি ষোলো আনার পূর্ণ তালুকদার হতেন। তখনই তিনি ‘চৌধুরী’ খেতাব লাভ করতেন।

অন্যদিকে, আমার নানা নভো মড়লের অতিপূর্বপুরুষরা নবাবী আমলের ভূস্বামী ছিলেন। তাঁদের পদবি ছিল ‘চৌধুরী’ এবং ‘সেখ’। সমাজে তাঁরা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন। নভো মড়লের প্রপিতামহের নাম ছিল রহমত আলী , যার নামে রহমতপুর গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি লক্ষ্মণশ্রী পরগণার ২৪৬০৯ নম্বর মহালের মিরাসদার ছিলেন। আমাদের কিছু কাগজপত্রেও নানার বংশীয় এই রহমত আলী তাং-এর নাম পাওয়া যায়।”

তিনি আরও বলেন, “রহমত আলী নিজে এক প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও ছিলেন একেবারে ভিন্নধর্মী মানুষ। তিনি ছিলেন ধর্মভীরু, সৎ এবং উদার হৃদয়ের অধিকারী। নিয়মিত মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতেন। প্রজাদের প্রতি তিনি কখনোই কঠোর হতেন না। অনেক সময় ভূমি কর আদায় না করে তাদের দুঃখ-দুর্দশায় পাশে দাঁড়াতেন। এমনকি কেউ ভূমি কর দিতে না পারলে তার কর মওকুফ করে দেওয়ার নজিরও রয়েছে।”

এই উদারতার কারণে এক সময় ব্রিটিশ সরকারের খাজনা পরিশোধ করতে না পেরে তিনি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনেন। জমির খাজনা শোধ করতে গিয়ে তাঁকে ধীরে ধীরে বন্দোবস্ত নেওয়া মৌজার অধিকাংশ ভূমিই বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। এমনকি সূর্যাস্ত আইনে কিছু ভূমি নিলামেও উঠেছিল।

তিনি জানান, “আমার নানার পূর্বপুরুষগণ মেরুয়াখলা, রাবারবাড়ি, মোহনপুর হয়ে রহমতপুরে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। কৈশোরে তিনি তাঁর নানা নভো মড়লের কাছে শুনেছেন, নানার প্রপিতামহের রহমতপুর ছাড়াও আরও বাড়ি ছিল। সে বাড়িগুলো ছিল মোহনপুর ও ধনপুরে। মোহনপুরের বাড়িটিতে কাচারিঘর ছিল; সেখানে বিচার-সালিশ বসত এবং অত্র অঞ্চলের ভূমি কর আদায় করে জমা রাখা হতো।

ভূমি করের মধ্যে ধান, মাছ এবং কৌড়ি (বা কড়ি) ছিল। সে সময় ধান ও মাছের দাম ছিল খুবই কম। দশসনার বন্দোবস্তের পূর্বে ১ টাকায় বাজার থেকে চার-পাঁচ মণ চাউল পাওয়া যেত। বন্দোবস্তের পর ধীরে ধীরে চাউলের দাম বাড়তে থাকে। প্রথমে ১ মণ চাউল পাওয়া যেত চার আনা দামে, পরে তা বেড়ে ১২ আনা, ১৬ আনা বা ১ টাকা হয়। এরপর আস্তে আস্তে ২ টাকা, ৩ টাকায় মন দরে বিক্রি হতে থাকে। এখন এসব শুনলে কিচ্ছার মতো মনে হলেও, সে সময় এগুলো ছিল সত্য ঘটনা। শৈশবে আমার নানা ও দাদার মুখে কতবার যে এসব কথা শুনেছি!”

সে সময় কৌড়ির প্রচলন ছিল শ্রীহট্টের সব পরগণায়। কড়ি বা কৌড়ির হিসাব ছিল নিম্নরূপ:
৪ কড়ি = ১ গণ্ডা, ৪ গণ্ডা = ১ বুড়ি, ৫ বুড়ি = ১ পণ, ১৬ পণ = ১ কাহণ, ১ কাহণ = ১ সিক্কা।
অর্থাৎ, ৮০ কৌড়িতে ১ পণ, এবং ১৬ পণে ১ কাহণ। কৌড়ি ছিল সর্বনিম্ন মানের মুদ্রা। এক কাহণ-কৌড়ি বলতে বোঝায় ১ পণ × ১৬ = ৮০ × ১৬ = ১২৮০ কৌড়ি। পরবর্তীকালে এই এক কাহণ-কৌড়িকে ১ সিক্কা রূপিয়া বা টাকার চতুর্থাংশ গণ্য করা হতো।

এই হিসাব প্রাচীনকাল থেকে খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষাংশ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দশসনার বন্দোবস্ত কালে শ্রীহট্টের তালুক বা মহাল ও পরগণানুযায়ী রাজস্বের যে হিসাব প্রস্তুত করেছিলেন, তাও কাহণ-কৌড়ির হিসাবেই করা হয়েছিল এবং ১ কাহণকে ১ সিক্কা রূপিয়ার চতুর্থাংশ গণ্য করা হয়েছিল। খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে কৌড়ির প্রথা উঠিয়ে নেয়।

সে সময় কৌড়ির আরেকটি হিসাবও প্রচলিত ছিল, যা ছিল নিম্নরূপ:
৪ কৌড়ি = ১ গণ্ডা, ৫ গণ্ডা = ১ পয়সা, ২০ গণ্ডা = ১ আনা বা ১ পণ, ১৬ পণ = ১ কাহণ বা ১ টাকা। তবে লিণ্ডেস সাহেব যখন শ্রীহট্টের রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন ৪ কাহণ বা ৫১২০ কৌড়ি-তে ১ টাকা গণ্য করা হতো। ১৮২০ সালের পর কৌড়ির প্রচলন বন্ধ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন সময়ে একটি কঠোর আইন প্রবর্তন করেছিল-সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law)। ১৭৯৩ সালের ১ মার্চ, লর্ড কর্নওয়ালিসের স্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) নীতির সঙ্গে এ আইন কার্যকর হয়। এই আইনের অধীনে মিরাশদার বা জমিদারদের নির্ধারিত দিনে সূর্যাস্তের আগে খাজনা জমা দিতে বাধ্য করা হতো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাজনা পরিশোধ না করলে তাদের জমি নিলামে তুলে দেওয়া হতো, এবং এতে কোনো ছাড় বা সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে বহু প্রাচীন জমিদার বা উপ-জমিদার বা মিরাশদার তাদের জমির অধিকার হারান, এবং সাধারণ প্রজারা চরম দুর্ভোগে পড়েন। ইতিহাসে সূর্যাস্ত আইন ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের এক নির্মম দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

এই সূর্যাস্ত আইনের ফলে প্রভাবিত হয়েছিলেন শ্রীহট্ট অঞ্চলের একজন প্রজাহিতৈষী মিরাশদার, রহমত আলী তাং। তিনি সরাসরি প্রজাদের কাছ থেকে ভূমি কর নিতেন না; বরং এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে জমি বণ্টন করে দিতেন, পরে তারা কর আদায় করে তা তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসতেন। রহমত আলী তাং ব্রিটিশ সরকারকে কয়েক বছর নিয়মিত খাজনা প্রদান করেছিলেন। তাঁর বাৎসরিক খাজনা ছিল ৫০ টাকা বা মুদ্রার অধিক। কিন্তু ধান-চালের দরপতনের কারণে প্রজারা সময়মতো কর দিতে পারতেন না, ফলে তাদের থেকে ভূমি কর আদায় করে সরকারের খাজনা পরিশোধ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হওয়ার পর রহমত আলী তাং-এর বন্দোবস্তকৃত কয়েকটি মৌজার খাজনা সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় সেগুলো সূর্যাস্ত আইনের আওতায় নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাঁর অধিকাংশ জমি হাতছাড়া হতে থাকে। এমনকি লক্ষ্মণশ্রী পরগণার গৌরারং নিবাসী ২৪৬০৩ নম্বর মহালের মিরাশদার লক্ষ্মণ রাম ও তাঁর অধস্তনদের সঙ্গে মৌজা-সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এ নিয়ে একসময় মামলা-মোকদ্দমার সূত্রপাত হয়, যেখানে অধিকাংশ মামলায় রহমত আলী তাং পরাজিত হন।

লক্ষ্মণ রাম নিঃসন্তান থাকায় ২৪৬০৩ নম্বর মহালের মালিকানা চলে যায় তাঁর ভাই জগদীশ রায়ের হাতে। পরবর্তী সময়ে এই বংশের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রাধাকান্ত চৌধুরী, শ্রীযুক্ত রাধাগোবিন্দ রায় চৌধুরী ও শ্রীযুক্ত নগেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ধীরে ধীরে রহমত আলীর অধিকাংশ ভূসম্পত্তি গৌরারং নিবাসী জমিদারদের দখলে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত রহমত আলীর দখলে কেবল রহমতনগর বা রহমতপুর মৌজাটি অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু সেটি নিয়েও গৌরারং নিবাসী জমিদারদের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়।

বি.দ্র.: ওই সময়েই তাঁর উত্তরসূরীদের দু-একজন গ্রাম ত্যাগ করে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। তাঁরা কোথায় আছেন, সে খবরও আজ আর কেউ জানে না। (তথ্যসূত্র: সিকন্দর আলী, জানিগাঁও)

উনিশ শতকের শেষভাগে রহমতপুরে বসবাসরত রহমত আলীর উত্তরপুরুষেরা এক সময় সবকিছু হারিয়ে প্রজা শ্রেণিতে পরিণত হন। ভূমির সঙ্গে হারিয়ে ফেলেন ভূমি-সম্পর্কিত পদ-পদবিও। একসময় তাঁদের সমস্ত ভূসম্পত্তি চিরতরে চলে যায় গৌরারং জমিদারদের হাতে।

সবকিছু হারালেও তারা কিন্তু বংশীয় ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মনোভাব হারাননি। সেটা নিয়ে তারা সগৌরবে চলতে থাকেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে আফসর আলী তাং-এর পুত্র শেখ বলু, শেখ গুলু, আদিল মুন্সী, শেখ আবিদ এবং মফসর বা মোবাসর আলী তাং-এর পুত্র নভো মড়ল, এলাহি বকস ও ওয়াজিদ আলী অন্যতম। তারাও রহমত আলীর ন্যায় গৌরারং নিবাসী জমিদার রাধাগোবিন্দ রায় চৌধুরী ও তাঁর পুত্র নগেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরীর সঙ্গে জুতসত্ত্ব দখলীয় জমির খাজনা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।

ফলশ্রুতিতে, জমিদার ও তার পুত্রগণ নানা প্রকার অত্যাচার শুরু করেন। একসময় রহমত আলির উত্তরসূরিদের কেউ কেউ পুনরায় পরগণা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবু তারা জমিদারদের নিকট কখনো মাথা নত করেননি। পুরো পরগণার মানুষ নিয়ে জমিদারদের সঙ্গে শালিসেও বসেন, যার ইতিহাস গ্রামের অধিকাংশ মানুষই জানেন।

খুব তেজী পুরুষ ছিলেন শেখ বলুর পুত্র শেখ আমানুল্যাহ। তিনি পরগণা ত্যাগ করার পূর্বে এক শালিসে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় জমিদার রাধাগোবিন্দ রায় চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “যারে এখবার লাইড় দেখাইছি, তারে আর মুখ দেখাইতাম না।”

এই বলে তিনি ও তার এক ছোট ভাই সেখ সফাতুল্যাহ পরিবারসহ জমিদারের চোখের সামনে পরগণা ত্যাগ করেন। তবু তিনি জমিদারের বশ্যতা স্বীকার করেননি।

যাই হোক, রহমত আলী ও রহমতপুর সম্পর্কে আব্দুস সামাদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “রহমত আলীর অধীনস্থ অঞ্চল এক সময় ‘রহমত আলীর তাল্লুক’ নামে পরিচিত ছিল। আমাদের রহমতপুর রহমত আলীর তাল্লুকের অন্তর্ভুক্ত। তার নামেই আমাদের গ্রাম। রহমতপুর মৌজা ছিল রহমত আলীর নিজ জুত। এ মৌজার অধিকাংশ জমি তিনি নিজের লোক দিয়ে আবাদ ও চাষ করাতেন, এবং উৎপন্ন ফসলের সবটুকু তিনি নিজেই গ্রহণ করতেন।”

রহমত আলী আব্দুস সামাদ সাহেবের পূর্বপুরুষ কিনা,তাঁকে যখন এই প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলেন, “দাদা ভাইয়ের মুখে একবার শুনেছিলাম, ইনি মড়ল বাড়ির ছিলেন। মড়ল বাড়ির কেউ হওয়া মানেই তো আমাদের মানুষ। এরাও তো আমাদেরই গোষ্ঠীর। তা ছাড়া, যদি আমাদের কেউ না-ইবা হতো, তবে নগেন বাবুর সঙ্গে খাজনা নিয়ে এত বিরোধ কেন ছিল? দাদা ভাই বলতেন, ‘তাদের জমি, তারা বাবুরে খাজনা দিবে কেন? খাজনা দিতে হলে গবর্নমেন্টকে দিবে।’ তবে রহমত আলীর নামে রহমতপুর গ্রাম, এটা তিনি কয়েকবার বলেছেন।”
[তথ্যসূত্র সংগ্রহ: ৩ মার্চ ১৯৯৫]

কথিত আছে, রহমত আলী তাং-এর পূর্বপুরুষেরা ২৪৬০৯ নং মহাল বন্দোবস্ত নেওয়ার পূর্ব থেকেই রহমতপুর গ্রাম বা মৌজা যে স্থানে অবস্থিত, সেই জায়গায় অর্থাৎ সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে রহমত আলী দশসনা বন্দোবস্ত নিলে, তিনি সেই স্থানের নাম রাখেন ‘রহমত নগর’। ওই স্থানেই তিনি প্রথম সম্পূর্ণ বাঁশের তৈরি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

সিকন্দর আলী জানান, “রহমত আলীর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও মৌজাটি সাতটি মৌজায় বিভক্ত হয়। তার মধ্যে একটি মৌজা ‘রহমত নগর’।” সিকন্দর আলীর এই মৌখিক গল্প এক সময় সত্যে পরিণত হয়, যখন রহমত আলীর দশসনা বন্দোবস্তের কাগজ আমাদের হাতে আসে। রহমত আলীর এই বন্দোবস্তের মূল কাগজ আমার হাতে হস্তান্তর করেন তাহিরপুর উপজেলার বালিঝুরি ইউনিয়নের মেঞ্জার গাঁও নিবাসী জনাব জয়নাল আবেদীন সাহেব। তাঁর পিতামহ সেখ আমান উল্যাহ ও সেখ সফাত উল্যাহ ব্রিটিশ আমলে গৌরারংয়ের জমিদারদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে লক্ষ্মণশ্রী পরগণার রহমতপুর গ্রাম ত্যাগ করে তৎকালীন লাউড় পরগণার শক্তিয়ারখলা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন।

লাউড় পরগণাটি ছিল গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর অধীনস্থ এলাকা। তার একটি নথি আমার কাছে হস্তান্তর করেন সেখ আমান উল্যাহ সাহেবের পৌত্র, বিডিআর সদস্য জনাব আব্দুল কাইউম। সেই নথি বা দাখিলায় প্রথম শ্রেণির প্রজা হিসেবে সেখ আমান উল্যাহ ও তার পিতা সেখ বুলুর নাম দেখতে পাওয়া যায়। সেই নথির হুবহু পাঠ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

শ্রীশ্রীকালী
১৩৪৯ সন
ময়মনসিংহ, গৌরীপুর এস্টেট
দাখিলা (প্রজার অংশ)
(শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৫ নং রুল – ৭২ ধারা)

ভূম্যধিকারীর নাম: শ্রীযুক্ত ব্রজেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, জমিদার মহাশয়
ক্রমিক নম্বর: ১৪২
তলব বাকীর নম্বর: ১০৪
তালুকের নাম ও নম্বর: ১২ নং রুদ্র রায় [চৌ-অস্পষ্ট]
যে মৌজায় জুত জমি অবস্থিত: শক্তিয়ারখলা
পরগণা: লাউড়
প্রজার নাম: সেখ আমান উল্যাহ
পিতার নাম ও বাসস্থান: রহ. সেখ বুলু, সাং শক্তিয়ারখলা, প্র: মধুপুর, স্টে: সুনামগঞ্জ, জিলা: শ্রীহট্ট
জোতের বিবরণ: সাধারণ
জমির পরিমাণ: ১।্। ১। ২।। ৯ মোট ১ হাল সোয়া সাত কেদার দুই যষ্টি মাত্র
বার্ষিক জমা: ১৫।।৯৯
সেস: ×
শিক্ষা কর: ×
সুদ ক্ষতিপূরণ: ×

মোট: ১৬.৯৯ মঃ ষোলো টাকা পনেরো যানি মাত্র

শ্রী নগেন্দ্রনাথ [ভাটট-অস্পষ্ট]
তহশিল কর্ম্মচারীর দস্তখত

আব্দুল কাইউম সাহেব জানান, এরকম মোট ২২টি দাখিলা ছিল লাউড় পরগণার বিভিন্ন মৌজায় সেখ আমান উল্যাহর নামে।

জয়নাল আবেদীন সাহেবের দেওয়া রহমত আলী তাং-এর দশসনা বন্দোবস্তের কাগজের প্রথম পাতায় যা লেখা আছে, তা হুবহু নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

পরগনার নাম: লক্ষ্মণশ্রী
মৌজার নাম: দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও, মৌপ্রং মৌজে-ঢাকুয়ার হাওর, রহমত নগর ওরফে রহমতপুর, মোহনপুর, সরদারপুর, জয় নগর, আহমদপুর, সাখাইতি
তৌজি লিখিত মহাল নম্বর: ২৪৬০৯
রহমত আলী তাং: দশসনা বন্দোবস্ত

এছাড়াও আরও কিছু লেখা রয়েছে, যা অস্পষ্ট, যেমন: তৌজির লিখিত মালিক ও হাল দখলদার গণের নাম যা আংশিক স্পষ্ট।
রহমতপুরের ওয়াহিদুল্যাহ মুন্সীর মুখ থেকে জানা যায়, রহমত আলীর সময়ে রহমত আলীর বন্দোবস্তকৃত ভূমি হাওর, বনজঙ্গল ও জলমহাল ছিল। মানুষজন ছিল না বললেই চলে। তাই তিনি দুহালিয়া পরগণা থেকে আবাদ করার জন্য লোকজন এনেছিলেন। পরবর্তীতে তারা কিংবা তাদের উত্তরসূরিরা অনেকেই হাল দখলদার মালিক হিসেবে পরিচিতি পান। তাদের কেউ কেউ নিজে আবাদ করেছেন, আবার কেউ কেউ অন্যকে দিয়ে চাষাবাদ করিয়ে রহমত আলীকে ভূমি কর দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ক্রয় করেও ভূমির মালিক হয়েছেন। এমন কথা তিনি তাঁর দাদার মুখে শুনেছেন।

এসব আসলে বহু বছর আগের ঘটনা। তাই আজকাল এই ইতিহাস নিয়ে আর কেউ তেমন চর্চা করে না। এখনকার সময়ে গ্রামের প্রায় কেউই জানে না যে রহমতপুর গ্রামের পূর্বনাম ছিল ‘রহমত নগর’। সবাই শুধু রহমতপুর নামটাই জানে। এমনকি আমি নিজেও জানতাম না, এই গ্রামের এক সময়কার নাম ছিল রহমত নগর।

১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের রহমত আলীর তাং-এর দশসনা বন্দোবস্তকৃত ধারাবিবরণী নথি বা দলিলের দ্বিতীয় পাতায় আরও ১৪টি ছোট ছোট মৌজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা যায়, পূর্বের ৭টি মৌজা থেকে উল্লিখিত ১৪টি মৌজা নতুন নামে খারিজ হয়েছিল।

ঐ মৌজাগুলোতে খরিদসূত্রে যেসব মালিকের নাম পাওয়া যায়, তারা হলেন:

রাধাকান্ত চৌধুরী (সাং গৌরাট),

জয়রাম দাস ও গোবিন্দ দাস (সাং সাখাইতি),

শেখ দাহন ও কবির (নামটি কিছুটা অস্পষ্ট), সাং অমিত্ত ছিরি।

রাধাকান্ত চৌধুরী লক্ষ্মণ রামের কততম অধস্তন পুরুষ ছিলেন, সেটা জানা গেলে বুঝা যেত ওই সময়ে রহমত আলী জীবিত ছিলেন কি না। তবে এটি সত্য, যদি ১৮৬২ ইং সালে রাধাকান্ত জীবিত থাকেন, তবে রহমত আলী নিশ্চিত বেঁচে নেই। কারণ রহমত আলী যে সময় দশসনা বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন, সেটি ছিল ১৭৯০ সাল। ধারণা করা হয়, বন্দোবস্তের সময় রহমত আলীর বয়স পঞ্চাশোর্ধ ছিল, কারণ দশসনা বন্দোবস্তের পূর্ব থেকেই তিনি তালুকদার পদবীধারী বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তি ছিলেন। বয়োজেষ্ঠ্য না হলে একটি গ্রাম বা মৌজার নাম তার নামানুসারে কখনও হতো না, এবং বয়োজেষ্ঠ্য না হলে এত বড় ভূসম্পত্তির মালিক তিনি হতে পারতেন না।

অল্পবয়সী হলে এ সম্পদের মালিক হয়তো তার পিতা বা পিতামহ থাকতেন। এমনটা হলে তখন হয়তো মৌজার নাম অন্যরকম বা অন্যকিছু হত।

রাধাকান্ত চৌধুরীর পুত্র রাধাগোবিন্দ রায় চৌধুরী এবং তাঁর পুত্র নগেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী। রাধাগোবিন্দ ও নগেন্দ্র কুমার দুজনই রহমত আলীর প্রপৌত্র সেখ বলু, নভো মড়ল এবং তাদের পুত্রদের সময়ের।

দশসনা বন্দোবস্তের নথি বা দলিল হাতে আসার পর আমরা জানতে পারি রহমতপুর গ্রামের পূর্বনাম ছিল ‘রহমত নগর’। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের দলিলে ‘রহমত নগর’ ওরফে ‘রহমতপুর’ দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত ওই সময় থেকেই ‘নগর’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পুর’ শব্দটি যুক্ত করে ‘রহমতপুর’ নামকরণ করা হয়। ১৭৯০ সালের পর, অর্থাৎ রহমত নগর নামকরণের সময় যদি আমরা রহমত আলীকে জীবিত ধরে নিই, তবে ৭২ বছর পর রহমত আলী জীবিত থাকার কথা নয়, যদি তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বা অধিক বয়স্ক অবস্থায় দশসনা বন্দোবস্ত নিয়ে থাকেন।
এতে বোঝা যায়, ‘রহমত নগর’ নামকরণের বয়স যদি ২৩৫ বছর হয়, তবে ‘রহমতপুর’ নামকরণের বয়স হবে প্রায় ১৬৩ বছর। এজন্য গ্রামের মানুষ ‘রহমত নগর’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। রহমতপুর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্ম পূর্বের নাম ভুলে যায়। সুতরাং, রহমত আলীর নামে গ্রামের নামকরণ ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়তো রহমত আলীর নামগন্ধ কিছুই থাকত না, যদি পুরোনো দলিল ও দস্তাবেজে তার নাম না থাকত।

পাকিস্তান ও ব্রিটিশ শাসনকালে লক্ষ্মণ ছিরি পরগণার রহমতপুর মৌজার জমি ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিটি দলিলে রহমত আলীর নাম দেখতে পাওয়া যায়।

দেশভাগের পূর্বে, ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের একটি দলিলে হুবহু কিছু লেখা তুলে ধরা হলো:

“ইয়াদিকিদ্ধ মহামহিম শ্রীযুক্ত মহেন্দ্র দাস, সাং নৌকাখালী, পরগণা লক্ষণ ছিরি, মহাশয় (অস্পষ্ট!)
লিখিতং শ্রীযুক্ত সেক তাজ মামুদ, শ্রীযুক্ত সেক সাহা মামদ, পিং মৃত সেক রহমান উল্যা ও শ্রীযুক্ত সেক আয়াত উল্যা, পিং মৃত সেক বলু সাং রহমতপুর পং, লক্ষ্মণ ছিরি-২৪৬০৯/১১ নং তাং রহমত আলি হইতে উত্তরাধি সূত্রে প্রাপ্ত ৩ নং হিস্যা সংক্রান্ত মৌজা রহমতপুরের অন্তর্গত এক খণ্ড তালুক মূলেদায়ী নিম্ন তফসিলভুক্ত (৪ একর ৬৮ শতক) আমন রকম জমি বহুকাল পূর্ব হইতে ভোগ দখল করিয়া আসিতেছি। টাকার প্রয়োজনে আমরা এই জমি পঞ্চাশ (৫০) টাকায় বিক্রি করিলাম।”

সময়ের ব্যবধানে সবকিছুই যেন লোককাহিনীর মতো শোনা যায়। গ্রামের দুই-একজন মুরব্বি না বললে হয়তো কেউ জানতেই পারত না, কীভাবে রহমতপুর গ্রামের নাম ‘রহমতপুর’ হয়েছিল।

রহমত আলী তাং-এর জীবন কেবল জমি আর পদবির গল্প নয়; এটি একজন মানুষের সততা, দয়া আর ধর্মচর্চার এক জীবন্ত স্মৃতি। তিনি হয়তো জমি রেখে যেতে পারেননি, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর নাম, যা আজও এই জনপদের মাটিতে ইতিহাস হয়ে জেগে আছে।

লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

গ্রন্থতালিকা

১. শ্রী কমলাকান্ত গুপ্ত চৌধুরী, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-পূর্ব শ্রীহট্টের ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থা, পৃ. ১৯।
২. অচ্যুতচরণ চৌধুরী, তত্ত্বনিধি: শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ, পৃ. ৪৪২।
৩. সিকন্দর আলী, মৌখিক সাক্ষাৎকার, জানিগাঁও, ২০১১ সাল।
৪. আব্দুস সামাদ সাহেব, মৌখিক সাক্ষাৎকার, ৩ মার্চ ১৯৯৫।
৫. জয়নাল আবেদীন, মেঞ্জারগাঁও, বালিঝুরি ইউনিয়ন, তাহিরপুর; রহমত আলী তাং-এর ১৭৯০ সালের দশসনা বন্দোবস্তের দলিল প্রদান।
৬. সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law), প্রবর্তন: ১ মার্চ ১৭৯৩; লর্ড কর্নওয়ালিসের স্থায়ী বন্দোবস্ত নীতির সঙ্গে কার্যকর।
৭. রহমত আলী তাং-এর দশসনা বন্দোবস্ত দলিল (১৭৯০), মৌজা: দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও; তৌজি নং: ২৪৬০৯।
৮. বন্দোবস্ত দলিল (১৮৬২), ‘রহমত নগর ওরফে রহমতপুর’ উল্লেখসহ।
৯. জমি ভোগ-বিক্রয় দলিল (১৯২৮) রহমত আলী তাং-এর নাম উল্লেখ।
১০. ওয়াহিদুল্যাহ মুন্সী, মৌখিক সাক্ষাৎকার, ৩ মার্চ ১৯৯৫।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102