
◑ শেখ একেএম জাকারিয়া
বাংলাদেশে প্রথম যে জাতিগোষ্ঠীর আগমন ঘটে, তারা হলো নেগ্রিটো। মূলত এই জনগোষ্ঠী আফ্রিকায় বসবাস করত এবং নিগ্রো জাতি নামে পরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, তারা আফ্রিকার ইথিওপিয়া ও সোমালিয়া অঞ্চল থেকে আগত।
নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী সিনাই উপত্যকা অতিক্রম করে প্রথমে আরব উপদ্বীপে প্রবেশ করে। সেখান থেকে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই পথ ধরেই তাদের একাংশ বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসতি গড়ে তোলে।
নৃতত্ত্ববিদদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৭৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছরের মধ্যে নেগ্রিটোরা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪০,০০০ থেকে ২০,০০০ সালের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। ধারণা করা হয়, তাদের হাত ধরেই উপমহাদেশে প্রস্তর যুগের সূচনা ঘটে।
তাদের জীবনধারা ছিল অত্যন্ত আদিম। তারা কৃষিকাজ বা আগুন ব্যবহারের কৌশল জানত না। প্রধানত গুহাবাসী ছিল এবং বড় বড় গাছের নিচে দলবদ্ধভাবে বাস করত। তাদের প্রধান খাদ্য ছিল বন্য পশুপাখি ও ফলমূল। তাদের দেহগঠনও ছিল আলাদা ধরনের। গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো, দেহ খর্বাকৃতি, ঠোঁট পুরু ও উল্টানো, চুল কুকড়ানো এবং নাক চেপ্টা। এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কালের প্রবাহে আজ প্রায় বিলুপ্ত। তবে এখনও বাংলাদেশের সুন্দরবন, যশোরের বাঁশফোঁড় ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিছু নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আফ্রিকার নিগ্রো জাতি থেকে উদ্ভূত এই নেগ্রিটোদের অস্তিত্ব ভারতীয় উপমহাদেশে এখন প্রায় বিলুপ্ত। তবে এখনও আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, কোচিন, ত্রিবাঙ্কুর, বিহারের রাজমহল পার্বত্য অঞ্চল এবং আসামের কিছু অংশে এদের বংশধরদের দেখা মেলে। বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাসরত সাঁওতাল, হাঁড়ি, চণ্ডাল, মুন্ডা ও ডোম জাতিগোষ্ঠীকে নেগ্রিটোদের উত্তরসূরী বলে মনে করা হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, নেগ্রিটোরা ঠিক কবে আমাদের দেশে বসতি স্থাপন করেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও বাংলার আদিম জনগোষ্ঠীর প্রথম স্তর হিসেবে তাদেরই চিহ্নিত করা হয়। জাতিগতভাবে বাঙালি কোনো মৌলিক জাতি নয়; এটি একটি সংকর জাতি। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির উদ্ভব হয়েছে। নেগ্রিটো, আদি অস্ট্রেলীয় (অস্ট্রিক বা অস্ট্রো-এশীয়), দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়, আর্য ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর রক্ত এই জাতির শিরায় মিশে আছে। তাই বাঙালিকে সংকর জাতি বলা হয়ে থাকে। বাঙালিদের আরেকটি নাম ‘নিষাদ জাতি’। এই শব্দের অর্থ শিকারি। প্রাচীন সাহিত্যে উল্লেখ রয়েছে, এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীরা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। সেই সূত্রেই তাদের নিষাদ নামে অভিহিত করা হতো।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
তথসূত্র:
১.বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড( রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
২. বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ(ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার
৩. ভারতের ইতিহাস কথা, ড. কিরণ চন্দ্র চৌধুরী
৪. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, (মাহবুবুল আলম)
৫. উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল।