মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত মহা অষ্টমীতে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও অনুদান বিতরণ করলেন ইউপি চেয়ারম্যান কামাল নকলায় এসবিসি প্রকল্পের এমএনসিএএইচ বিষয়ে জনসংলাপ

ভাষার ভেতর সিলেট: জাতিসত্তার এক দীর্ঘ যাত্রা :: তৈয়বুর রহমান

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০৬ বার পড়া হয়েছে
২৯২
বাংলাদেশের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আলোচনায় সিলেট একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই জনপদ শুধু তার পাহাড়, হাওর, চা-বাগান কিংবা প্রবাসী অধ্যায়ের জন্য স্বতন্ত্র নয়; এর রয়েছে নিজস্ব ভাষিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, সাহিত্যিক স্মৃতি এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচয়। সেই পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে সিলেটি ভাষা।
সিলেটি ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই দুটি প্রশ্ন সামনে আসে—সিলেটি কি বাংলার একটি উপভাষা, নাকি স্বতন্ত্র ভাষা? আর ‘সিলেটি জাতি’ বলতে কি আলাদা কোনো জাতিকে বোঝানো যায়, নাকি এটি বৃহত্তর বাঙালি পরিচয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর পরিচয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, ভাষাবিজ্ঞান, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান ও অভিবাসন-গবেষণার আলোকে খোঁজা প্রয়োজন।
প্রথমেই বলা দরকার, ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’র মধ্যে সীমারেখা সবসময় বৈজ্ঞানিকভাবে একটি সরল রেখা দিয়ে টানা যায় না। পারস্পরিক বোধগম্যতা, ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার, ঐতিহাসিক বিকাশ, লিখিত ঐতিহ্য, ভাষাভাষীদের আত্মপরিচয় এবং রাষ্ট্রীয়-সামাজিক মর্যাদা—সবকিছু মিলিয়ে কোনো ভাষার অবস্থান নির্ধারিত হয়। এই কারণেই সিলেটিকে শুধু ‘বাংলার বিকৃত উচ্চারণ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে বাংলা ও সিলেটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক অস্বীকার করাও সঠিক নয়।
সিলেটি পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর একটি ভাষিক রূপ। এর সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু এর ধ্বনি, উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রমিত বাংলা থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। ফলে সিলেটির স্বাতন্ত্র্য শুধু আঞ্চলিক উচ্চারণের পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা বৈজ্ঞানিক নথিবদ্ধকরণ ও গবেষণায় সিলেটির নিজস্ব ব্যাকরণগত কাঠামো এবং ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে পৃথকভাবে কাজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাষা-নথিবদ্ধকরণ উদ্যোগেও সিলেটিকে স্বতন্ত্রভাবে গবেষণার বিষয় করা হয়েছে।
এখানে ‘ভাষা’ বনাম ‘উপভাষা’ বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। কোনো ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা কম হলেই সেটি ভাষাবৈজ্ঞানিক অর্থে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় না। পৃথিবীর বহু ভাষারই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, কিন্তু সেগুলোর নিজস্ব ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য ও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সিলেটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
নাগরি লিপি: সিলেটি পরিচয়ের লিখিত সাক্ষ্য:
সিলেটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হলো সিলেটি নাগরি লিপি। কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব লিখনপদ্ধতির অস্তিত্ব তার ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সিলেটি নাগরি ছিল সিলেটি ভাষা লেখার ঐতিহাসিক লিপি। SOAS Sylheti Project-এর তথ্য অনুযায়ী, সিলেটি ঐতিহ্যগতভাবে একটি স্বতন্ত্র নাগরি লিপিতে লেখা হতো। লিপিটির ব্যবহার অন্তত কয়েক শতাব্দী পুরোনো এবং উনিশ শতকে এ লিপির নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্রও ছিল।
 বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে একে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সিলেটি নাগরি Unicode-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কম্পিউটার ও স্মার্টফোনেও এ লিপি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
সিলেটি নাগরির গুরুত্ব কেবল এর বর্ণমালায় নয়। এই লিপিতে পুঁথি, ধর্মীয় সাহিত্য, কবিতা ও লোকসাহিত্য রচিত হয়েছে। সিলেটের পুঁথি-পাঠের ঐতিহ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌখিক-সাহিত্যিক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল। সিলেটি পুঁথি নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণে বর্তমানে বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে; পুরোনো পুঁথি সংগ্রহ, আলোকচিত্র ধারণ, পাঠোদ্ধার, অনুবাদ ও অভিধান তৈরির কাজও হচ্ছে।
সুতরাং সিলেটি নাগরিকে কেবল একটি হারিয়ে যেতে বসা লিপি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। এটি সিলেট অঞ্চলের মানুষের সাহিত্যিক স্মৃতি এবং নিজস্ব ভাষায় জ্ঞান ও সংস্কৃতি প্রকাশের একটি ঐতিহাসিক মাধ্যম।
কেন নাগরি হারিয়ে গেল?
সিলেটি নাগরির পতনকে শুধু ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর সঙ্গে শিক্ষা, প্রশাসন, মুদ্রণব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাষানীতির সম্পর্ক রয়েছে।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা লিপির ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়, প্রশাসন ও সরকারি কাজে বাংলা লিখিত রূপের প্রাধান্য তৈরি হয়। ফলে সিলেটি নাগরি ধীরে ধীরে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর হারাতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এসে এর ব্যবহার আরও সংকুচিত হয়।
এর ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিলেটি ভাষা মানুষের মুখে জীবন্ত থাকলেও এর ঐতিহ্যবাহী লিখিত রূপ অনেকাংশে অচল হয়ে পড়েছে। ভাষা টিকে আছে, কিন্তু ভাষার লিখিত স্মৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ দুর্বল হয়েছে।
এখানে বর্তমান সময়ের একটি আশাব্যঞ্জক দিকও রয়েছে। সিলেটি নাগরি এখন ডিজিটাল জগতে ফিরে আসছে। Unicode-এ অন্তর্ভুক্তি, নাগরি শেখানোর উদ্যোগ, ডিজিটাল ফন্ট, অনলাইন পাঠ এবং গবেষণামূলক প্রকল্প নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। SOAS Sylheti Project ২০২৬ সালেও নাগরি লিপির calligraphy ও writing practice নিয়ে কাজ করেছে।
১৮৭৪: একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে পরিচয়ের ইতিহাস বদলে দিল?
সিলেটি জাতিসত্তার আধুনিক ইতিহাস বুঝতে ১৮৭৪ সাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন সিলেটকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে সরিয়ে নতুনভাবে গঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে সিলেট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বাংলার মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা অবস্থানে চলে যায়।
ইতিহাসবিদ আশফাক হোসাইনের গবেষণায় ১৮৭৪ সালের এই পরিবর্তনকে সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর গবেষণা দেখায়, সিলেটকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথ, পরিচয় এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
আরও সাম্প্রতিক সমাজবৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও ১৮৭৪ সালকে সিলেটি পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সিলেটের বাংলার বাইরে প্রশাসনিক অবস্থান, অসমিয়া ও অ-সিলেটি বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন সিলেটি পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ সিলেটি পরিচয় কোনো আকস্মিক বা সাম্প্রতিক নির্মাণ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
১৯৪৭: দেশভাগ ও সিলেটি পরিচয়ের পুনর্গঠন
১৯৪৭ সালের দেশভাগ সিলেটি ইতিহাসের দ্বিতীয় বড় বাঁক। ভারত বিভাগের আগে সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের ফলাফলের পর সিলেটের বৃহত্তর অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে করিমগঞ্জ মহকুমার অংশবিশেষ ভারতের আসামে থেকে যায়।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সিলেটি জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক ঐক্যকে ভেঙে দেয়। একই ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ দুই রাষ্ট্রের ভেতরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অভিবাসন, বাস্তুচ্যুতি ও প্রবাসী জীবনের কারণে সিলেটি জনগোষ্ঠী আরও বিস্তৃত ভূগোলে ছড়িয়ে পড়ে।
সিলেটি পরিচয় নিয়ে গবেষণায় ১৮৭৪ ও ১৯৪৭—এই দুটি বছর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৫ সালে Sociological Bulletin-এ প্রকাশিত Nabanipa Bhattacharjee ও Manish Thakur-এর গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১৮৭৪ সালের প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা সিলেটি পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সেই পরিচয়কে নতুন করে পুনর্গঠনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
এ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—সিলেটি পরিচয় নিজেকে বৃহত্তর বাঙালি পরিচয়ের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড় করায়নি। বরং ‘বাঙালি’ ও ‘সিলেটি’—দুটি পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে পাশাপাশি অবস্থান করেছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের আত্মপরিচয়ে ভিন্ন গুরুত্ব পেয়েছে।
এটি বাংলাদেশের পরিচয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশি, বাঙালি এবং সিলেটি হতে পারেন। পরিচয়ের এই স্তরগুলো পরস্পরকে বাতিল না করে বরং পরস্পরকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
সিলেটি জাতিসত্তা: জাতি, নাকি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী?
‘সিলেটি জাতি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করার সময় তাই কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অর্থে সিলেটি একটি পৃথক সার্বভৌম জাতি—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক অর্থে সিলেটিদের একটি শক্তিশালী ethnolinguistic বা ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
একটি জনগোষ্ঠীর জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয় শুধু রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে তৈরি হয় না। ভাষা, যৌথ ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক স্মৃতি, খাদ্যাভ্যাস, আচার-অনুষ্ঠান, আত্মপরিচয় এবং প্রজন্মান্তরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে।
সিলেটি পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলো একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে দেশভাগ ও অভিবাসন সিলেটি পরিচয়কে ভৌগোলিক সীমার বাইরে নিয়ে গেছে।
ভারতে সিলেটি পরিচয় নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, দেশভাগের পর ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সিলেটিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠন, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং স্মৃতিচর্চা পরিচয় পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রবাস: সিলেটি পরিচয়ের দ্বিতীয় ভূগোল
সিলেটের ইতিহাসের সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ঔপনিবেশিক যুগে শ্রম, বাণিজ্য ও নৌযাত্রার মাধ্যমে সিলেটিদের দেশের বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিলেটিদের বড় প্রবাসী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
ফলে সিলেটি পরিচয় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আজ লন্ডন, বার্মিংহাম, নিউইয়র্ক, টরন্টোসহ বিভিন্ন শহরে সিলেটি পরিবার ও সামাজিক সংগঠন রয়েছে। সেখানে সিলেটি ভাষা অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই প্রবাসী বাস্তবতা সিলেটি ভাষার জন্য যেমন শক্তি, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা সাধারণত সিলেটির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক ধরে রাখলেও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ইংরেজি বা বসবাসের দেশের প্রধান ভাষার প্রভাব বাড়ে। ফলে ভাষা প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ সিলেটি ভাষার ভবিষ্যৎ শুধু বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ওপর নির্ভর করছে না; প্রবাসী সিলেটি সম্প্রদায়ের ভাষাচর্চাও এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ভাষার সবচেয়ে বড় সংকট কোথায়?
সিলেটি ভাষার সবচেয়ে বড় সমস্যা বক্তার সংখ্যা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার ও মর্যাদার সীমাবদ্ধতা।
একটি ভাষা শুধু তখনই শক্তিশালী হয় না যখন অনেক মানুষ সেটি কথা বলে। ভাষার শক্তি নির্ভর করে এটি কত প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং শিক্ষা, সাহিত্য, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।
সিলেটি এখনো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এর লিখিত মানরূপ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে সীমিত। এ কারণে সিলেটি জানা একজন ব্যক্তি অনেক সময় নিজের ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারলেও লিখতে পারেন না।
এখানেই ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
 কোনো ভাষা যদি শুধু ঘরের কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং বিদ্যালয়, বই, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চায় প্রবেশ করতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রজন্মান্তর হস্তান্তর দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সিলেটির ক্ষেত্রে আশার জায়গাটিও কম নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগগুলো দেখাচ্ছে যে ভাষাটিকে ডিজিটাল যুগে নতুনভাবে নথিবদ্ধ করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সিলেটি ভাষা
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা সিলেটি নাগরির জন্য একটি Text-to-Speech বা TTS corpus তৈরির কথা জানিয়েছে। গবেষণাটিতে ১৫ ঘণ্টার বেশি অডিও এবং ৮,২৬৮টি বাক্য নিয়ে একটি speech corpus তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল সিলেটি নাগরির মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের speech technology-তে ভাষাটিকে অন্তর্ভুক্ত করার ভিত্তি তৈরি করা।
এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভাষা সংরক্ষণের ধারণা এখন আর শুধু পুরোনো বই, পুঁথি বা অভিধান সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নেই। একটি ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার digital presence-এর ওপরও।
ভবিষ্যতে সিলেটির জন্য উন্নত speech-to-text, text-to-speech, machine translation, spell-checking, optical character recognition এবং AI-based language learning system তৈরি করা গেলে ভাষাটির ব্যবহার নতুন প্রজন্মের কাছে অনেক সহজ হবে।
একইভাবে সিলেটি নাগরি লিপিকে ডিজিটাল কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি হারিয়ে যেতে বসা লিখিত ঐতিহ্য নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন জীবন পেতে পারে।
সংরক্ষণ মানে বাংলা বিরোধিতা নয়
সিলেটি ভাষা সংরক্ষণের প্রশ্নে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক হলো—এটি কি বাংলা ভাষার বিরোধিতা করবে?
বাস্তবে এর কোনো প্রয়োজন নেই।
বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় জীবনের প্রধান ভাষা। শিক্ষা, প্রশাসন, সাহিত্য ও গণমাধ্যমে বাংলার গুরুত্ব অস্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না। একই সঙ্গে ইংরেজিও উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি সিলেটি ভাষা সংরক্ষণ করা সম্ভব। একজন শিশু ঘরে সিলেটি বলতে পারে, বিদ্যালয়ে বাংলা শিখতে পারে এবং পাশাপাশি ইংরেজিতেও দক্ষ হতে পারে। বহুভাষিকতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত সম্পদ।
তাই সিলেটি ভাষার সংরক্ষণকে বাংলা ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে নয়, বাংলাদেশের বহুভাষিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
সামনে কী করা দরকার?
সিলেটি ভাষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত ভাষা-নথিবদ্ধকরণ উদ্যোগ। সিলেটের বিভিন্ন এলাকার ভাষিক বৈচিত্র্য, উচ্চারণের পার্থক্য, প্রবাদ-প্রবচন, লোকগান, পুঁথি, শিশুভাষা, কৃষি ও হাওরজীবনের শব্দভাণ্ডার, স্থানীয় স্থাননাম এবং বয়স্ক মানুষের মৌখিক ইতিহাস অডিও-ভিডিওসহ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
একটি পূর্ণাঙ্গ সিলেটি অভিধান ও ব্যাকরণ প্রণয়ন করা দরকার। সিলেটি নাগরি লিপির পুরোনো পুঁথিগুলো ডিজিটাইজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলা লিপিতে সিলেটি ভাষার আধুনিক সাহিত্য এবং নাগরি লিপিতে ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য—দুই ধারারই চর্চা বাড়ানো যেতে পারে।
শিশুদের জন্য সিলেটি গল্পের বই, লোককাহিনি, কার্টুন, অডিওবুক ও ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Sylheti Studies, ভাষাবিজ্ঞান, লোকসংস্কৃতি ও diaspora studies-এর সমন্বিত গবেষণার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
গণমাধ্যমেরও এখানে ভূমিকা রয়েছে। সিলেটি ভাষায় অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার, লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান, নাটক, গল্প ও ইতিহাসভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি হলে ভাষাটি শুধু ঘরের ভেতরে নয়, জনপরিসরেও মর্যাদা পাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অবশ্য পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। বাবা-মা যদি সন্তানকে নিজের ভাষায় কথা বলতে উৎসাহ দেন, তবে ভাষাটি প্রজন্মান্তরে সহজেই বেঁচে থাকবে।
শেষ কথা
সিলেটি ভাষার ইতিহাস আসলে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। এই ইতিহাসে আছে প্রাচীন জনপদ, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ১৮৭৪-এর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৪৭-এর গণভোট ও দেশভাগ, অভিবাসন, প্রবাস এবং নতুন শতাব্দীর প্রযুক্তিগত রূপান্তর।
সিলেটি ভাষাকে তাই শুধু ‘আঞ্চলিক ভাষা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর ইতিহাসকে বৃহত্তর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করাও ঠিক নয়। বরং সিলেটি একটি ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা স্বতন্ত্র ভাষিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়, যার সঙ্গে বৃহত্তর বাঙালি পরিচয়ের সম্পর্ক একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও স্বাতন্ত্র্যময়।
একসময় সিলেটি নাগরিতে পুঁথি লেখা হয়েছে। পরে সেই লিপি প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু ভাষাটি হারায়নি। আজও মানুষের মুখে, ঘরে, আড্ডায়, গানে, প্রবাসী জীবনে সিলেটি বেঁচে আছে। সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত গবেষণা আবার প্রমাণ করছে—সিলেটিকে ডিজিটাল যুগেও নথিবদ্ধ ও পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
অতএব সিলেটি ভাষা সংরক্ষণ কোনো অতীতমুখী আবেগ নয়; এটি ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক নীতির অংশ হওয়া উচিত।
একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না—হারিয়ে যায় মানুষের হাসি-কান্নার একটি নিজস্ব ধরন, হারিয়ে যায় লোকস্মৃতির একটি ভাণ্ডার, হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল।
সিলেটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ তাই বাংলা ভাষাকে দুর্বল করা নয়। বরং বাংলাদেশের ভাষিক বহুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করা।
কারণ একটি দেশের শক্তি শুধু তার একটি বৃহৎ ভাষায় নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে সেই দেশের প্রতিটি জীবন্ত ভাষার স্মৃতি, বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার মধ্যে।
লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক ও লেখক
তথ্যসূত্র:
Bhattacharjee, Nabanipa & Thakur, Manish. “Forging and Foraging Ethnic Identity: The Sylhet Association of Delhi.” Sociological Bulletin, Vol. 74, Issue 1, 2025. DOI: 10.1177/00380229241306094.
Hossain, Ashfaque. “The Making and Unmaking of Assam-Bengal Borders and the Sylhet Referendum.” Modern Asian Studies, Cambridge University Press, 2012.
Hossain, Ashfaque. Historical Globalization and Its Effects: A Study of Sylhet and Its People, 1874–1971. PhD Dissertation, University of Nottingham, 2009.
Bhattacharjee, Nabanipa. “We are with culture but without geography: Locating Sylheti identity in contemporary India.” South Asian History and Culture, Vol. 3, Issue 2, 2012.
Thaut, Marie / SOAS Sylheti Project. Syloti/Siloti/Sylheti Nagri Writing Practice, SOAS University of London, 2024.
SOAS Sylheti Project. Sylheti Nagri script, language documentation and educational resources.
End-to-end Variational Speech Synthesis for the Endangered Sylheti Nagri Language. Systems and Soft Computing, Vol. 8, 2026, Article 200496. DOI: 10.1016/j.sasc.2026.200496.

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102