
জাহিদুল হক,বিশেষ প্রতিনিধি,যুক্তরাজ্য:
ইউরোপে ভ্রমণের নিয়মে এসেছে বড় পরিবর্তন। ১২ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে নতুন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা Entry/Exit System (EES), যা সাধারণভাবে “স্মার্ট গেট” নামে পরিচিত।
এর ফলে এখন থেকে ইউরোপের (Schengen) দেশগুলোতে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় আর হাতে পাসপোর্টে স্ট্যাম্প দেওয়া হবে না। তার পরিবর্তে যাত্রীদের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটার সিস্টেমে রেকর্ড হবে।
কীভাবে কাজ করবে নতুন স্মার্ট গেট:
EES মূলত একটি ডিজিটাল সীমান্ত চেক সিস্টেম, যেখানে ভ্রমণকারীদের পাসপোর্ট স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখের ছবি (facial image) ও আঙুলের ছাপ (fingerprints) নেওয়া হবে। এই তথ্যগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা হবে।
প্রথমবার ইউরোপে প্রবেশের সময় এই তথ্য সংগ্রহ করা হবে, পরবর্তী ভ্রমণে শুধু যাচাই করা হবে। অর্থাৎ একবার রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে, ভবিষ্যতে স্মার্ট গেট দিয়ে দ্রুত সীমান্ত পার হওয়া যাবে।
কারা পড়বে এই নিয়মের আওতায়:
নতুন এই সিস্টেম শুধুমাত্র **non-EU নাগরিকদের** জন্য প্রযোজ্য — অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, Schengen অঞ্চল ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিক ছাড়া অন্য সবাইকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের পর্যটক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।
১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে মুখের ছবি তোলা হতে পারে।
উদ্দেশ্য ও সুবিধা:
ইউরোপীয় কমিশনের মতে, EES চালুর মাধ্যমে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার হবে, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং যাত্রীদের জন্য সীমান্ত পারাপার আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
ইউরোপীয় কমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,ম্যানুয়াল স্ট্যাম্পের যুগ শেষ হলো। EES সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং আধুনিকতার নতুন মান স্থাপন করবে।”
ধাপে ধাপে চালু হচ্ছে সিস্টেমটি:
প্রথম ধাপে EES চালু হয়েছে ইউরোপের ২৯টি Schengen দেশের বাহির সীমান্তে, যার মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসসহ গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলো রয়েছে।
ধীরে ধীরে সব সীমান্তে এই ব্যবস্থা চালু হবে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন।
বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য কী পরিবর্তন আসছে:
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ইউরোপে প্রবেশের নিয়ম এখন আগের চেয়ে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ হচ্ছে।
আগে প্রবেশের সময় পাসপোর্টে হাতে স্ট্যাম্প দেওয়া হতো, এখন সেই তথ্য সরাসরি EES ডাটাবেসে সংরক্ষিত হবে।
এর ফলে কেউ নির্ধারিত সময়ের বেশি ইউরোপে অবস্থান করলে (overstay করলে) তা সহজেই শনাক্ত হবে।
ইউরোপগামী যাত্রীদের তাই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—বিমানবন্দরে আগেভাগে পৌঁছানো এবং স্মার্ট গেটে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় হাতে রাখা।
পরবর্তী ধাপ: ETIAS আসছে:
EES চালুর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি নতুন ভ্রমণ অনুমোদন ব্যবস্থা ETIAS (European Travel Information and Authorisation System) চালু করার পরিকল্পনা করছে। এটি ২০২৬ সালের মধ্যে কার্যকর হবে।
ETIAS চালুর পর ইউরোপ ভ্রমণের আগে অনলাইনে পূর্বানুমতি নিতে হবে, ঠিক যুক্তরাষ্ট্রের ESTA ব্যবস্থার মতো।
দুই সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপে রূপান্তর করবে।
EES চালুর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই “স্মার্ট গেট” ভ্রমণকারীদের জন্য যেমন সময় বাঁচাবে, তেমনি অবৈধ অবস্থান ও জাল পাসপোর্টের ঝুঁকিও কমাবে।