মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
মামলাবাজ ঘুষখোরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন। সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের তাণ্ডব: ২ জনের মৃত্যু, শান্তিগঞ্জে আহত ৩ শান্তিগঞ্জে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী সভা অনুষ্ঠিত শান্তিগঞ্জে এম এ মান্নান প্রাথমিক মেধা বৃত্তির পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন সমন্বিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব: এমপি কয়ছর আহমদ একদিনের দাওরাই সফর রাজাপুর-কাঠালিয়ার রাজনীতির অগ্নিপুরুষ: রাজপথ থেকে গণমানুষের হৃদয়ে হাবিবুর রহমান সেলিম রেজা নকলায় ১০৪৯৭ পরিবারের মাঝে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি সুনামগঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে নবাগত জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় সভা বিশ্ব ল্যাবরেটরি দিবসে সুনামগঞ্জে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

একদিনের দাওরাই সফর

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১০ বার পড়া হয়েছে
১১৮

✪শেখ একেএম জাকারিয়া
গত রমজান মাসে আমি ও দৈনিক সুনাম দিগন্তের সম্পাদক রাহমান তৈয়ব সিদ্ধান্ত নিই যে কবি ও গবেষক এ. এস. এম. ওয়াজেদ সাহেবের জন্মভূমি দাওরাই গ্রামে ঈদপরবর্তী যে কোনো একদিন হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যাব। দীর্ঘদিন ধরেই আমার মনে মহান দরবেশ, সাধক পুরুষ শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) সম্পর্কে কৌতূহল কাজ করছে। রাহমান তৈয়ব একজন শিক্ষক, সংবাদকর্মী, লেখক ও সুন্দর মনের মানুষ। যে কারণে তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করি। কোথাও ঘুরতে গেলে তাকেই প্রথমে অবগত করি।

যাইহোক, আমরা দাওরাই গ্রামে যাব এ কথা আমি ও রাহমান তৈয়ব, দুজনই ওয়াজেদ সাহেবকে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে অবগত করি। ওয়াজেদ সাহেব খুব খুশি হলেন। আমরা তাঁর পিতৃভূমি দর্শনে যাব, এতে তিনি আনন্দ প্রকাশ করলেন। ইতিপূর্বে তিনি আমাকে কয়েকবার দাওরাই গ্রামে যাওয়ার জন্য বলেছেন। তাই এবার সিদ্ধান্ত নিই, যাবই।

আমরা সুনামগঞ্জ থেকে মোট তিনজন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি, রাহমান তৈয়ব ও আশ্রাফুল আলম মোঃ নূরুল হুদা। তারিখ ২৭ মার্চ ২০২৬ খ্রি., রোজ শুক্রবার। সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের গাড়িতে সুনামগঞ্জ নতুন বাস টার্মিনাল থেকে আমি ও আশ্রাফুল আলম মোঃ নূরুল হুদা উঠব, আর শান্তিগঞ্জ থেকে রাহমান তৈয়ব আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠবেন। এই সিদ্ধান্ত তিনজনের সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আর ওয়াজেদ সাহেবের সঙ্গে কথা হয়, দাওরাই বাজারে আমরা জুম্মার নামাজ আদায় করব। যাত্রার দিন, অর্থাৎ ২৭ তারিখ, সকাল ৭টায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি হাতমুখ ধুয়ে নূরুল হুদা সাহেবকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি, “কয়টায় বের হবেন?” তিনি জবাবে আধঘন্টার মধ্যে বের হবেন বলে ফোন রেখে দেন। তিনি আমাকে গুরুতুল্য মনে করেন, যদিও তিনি বয়সে আমার চেয়ে বড় এবং পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি একটি আদর্শ পেশার সঙ্গে যুক্ত।
ফোন রেখে আমি গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে প্রবেশ করি। অনেক সময় ধরে গোসল শেষে বের হতেই আমার স্ত্রী মিতালি তালুকদার আমাকে বললেন, “আম্মা তোমাকে ফোন দিচ্ছেন, তৈয়বুর নাকি তোমাকে খুঁজছে।” আমি ফোন হাতে নিয়ে দেখি, তৈয়বুরের অনেকগুলো কল এসেছে। আমি প্রথমে আম্মাকে ফোন দিই। পরে আম্মাও একই কথা বলেন। এরপর তৈয়বুরের সঙ্গে কথা হয়। সে সুনামগঞ্জ আসছে। মনে মনে খুশিই হই, একসঙ্গে আমরা তিনজন সুনামগঞ্জ থেকে উঠব।

ইতোমধ্যে ৮টা ৪০ বেজে গেছে। আমি নূরুল হুদা সাহেবকে পুনরায় ফোন দিই। তিনি জানান, তিনি নিয়ামতপুর নামক স্থানে আছেন। দেরি করার জন্য তিনি বারবার দুঃখ প্রকাশ করতে থাকেন। যাইহোক, একসময় তিনি সুনামগঞ্জ ব্রিজে পৌঁছান। তখন আমিও ঘর থেকে বের হই। হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাই এবং নূরুল হুদা সাহেবকে ফোন দিই। তিনি নীলাদ্রি কাউন্টারে বসে আছেন। আমিও কাউন্টারে প্রবেশ করে তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করি এবং পাশে বসি।

টিকিট কাউন্টারের লোকজন আমার পরিচিত। তারাও হাসিমুখে আমাদের বসতে বলল। আমরা দুজন গল্প করতে থাকি এবং রাহমান তৈয়বের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। এমন সময় নূরুল হুদা সাহেবের এইচএসসি পড়ুয়া সুন্দরী এক নাতনি ও নাতনির বাবা এলেন। নাতনিকে তিনি পাশে বসিয়ে খোশগল্পে মেতে উঠলেন।
১০টা ১০ মিনিটে রাহমান তৈয়ব এল। কাউন্টারের ম্যানেজারের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ১৫ মিনিট আগেই জগন্নাথপুরগামী বাসে উঠে বসি। আমি ও নূরুল হুদা সাহেব এক পাশে, আর রাহমান তৈয়ব অন্য পাশে বসে। নূরুল হুদা সাহেব বলছিলেন, তৈয়বকে আমার পাশে বসতে। কিন্তু তৈয়ব ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে বসেনি।
…..

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে আমরা যাচ্ছি জগন্নাথপুর উপজেলার দাওরাই গ্রামে। বাস চলছে। লোকাল গাড়ি, কিছুক্ষণ পরপর বাস থামিয়ে যাত্রী উঠাচ্ছে। কিছুটা বিরক্তিও লাগছিল। কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। এই রোডে বিরতিহীন বাস নেই।
পথিমধ্যে বাসে এমন ভিড় লেগেছে যে, দাঁড়ানোর মতোও জায়গা নেই। সবাই ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় দুজন ষাটোর্ধ্ব মহিলা বাসে উঠলেন। সিট না পেয়ে একজন মহিলা নিচে বসে পড়লেন।
তৈয়বের মহান হৃদয়। সে নিজে সিট থেকে উঠে ওই দুই মহিলাকে তার সিটে বসতে দিল। তৈয়ব সিট থেকে উঠে এমনভাবে কথা বলছিল, যেন মহিলা দুজনকে সে পূর্ব থেকেই চিনে।
আমিও মনে মনে ভাবছিলাম, আমি যদি সিটটি দিতে পারতাম। যাইহোক, কিছুদূর গিয়ে মহিলা দুজন নেমে পড়লেন। তৈয়ব আবার শান্তিতে তার সিটে বসে পড়ল।
আমরা একসময় জগন্নাথপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যাই। সেখান থেকে তিনজন টমটম বা অটোরিকশায় সৈয়দপুরে আসি। টমটমচালক আমাদের চৌধুরী বাড়ির গেইটে নামিয়ে দেয়।
আমরা চৌধুরী বাড়ি জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করি। দাওরাই বাজারে জুম্মা পড়তে গেলে হয়তো নামাজ আর ধরা যেত না। তখন দুপুর ১টা বাজতে চলল।
বাসস্ট্যান্ড থেকে সৈয়দপুরে আসার পথে বেশিরভাগই ইটের বাড়িঘর চোখে পড়ল। পাশাপাশি কয়েকটি ছোটখাটো মাজার, মোকাম, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ও বাড়ি চোখে পড়ে। জগন্নাথপুরে বেশির ভাগ মানুষই ইউরোপ ও আমেরিকা প্রবাসী। কিছু কিছু বাড়ির ভেতরে কয়েক একর পর্যন্ত জমি রয়েছে।
নামাজ শুরুর পূর্বে আমরা অজুখানায় যাই। অজুখানায় যাওয়ার পথে একটি দৃষ্টিনন্দন গেইট চোখে পড়ে। সেই গেইটে লেখা আছে, “পারিবারিক কবরস্থান, চৌধুরী বাড়ি। চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মরমি কবি সৈয়দ আশহর আলি চৌধুরী।”
অজু শেষে দেখা হয় সাইফুল ইসলাম নামের ষাটোর্ধ্ব, সাদা দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তির সঙ্গে। নূরুল হুদা সাহেবের কথায় ওই বৃদ্ধলোকটিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে সুন্নত নামাজ আদায় করি।
খুতবা পাঠের আগে মসজিদের ইমাম সাহেবের কথা আমাদের বেশ ভালো লাগে। খুবই ফর্সা ও মায়াবী চেহারার ইমাম সাহেব। তিনি বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, “হে যুবকগণ, তোমরা তোমাদের সতিত্ব রক্ষা করো। সতিত্ব শুধু যুবতী নারীদের রক্ষা করলে চলবে না, যুবকদেরও তা রক্ষা করতে হবে।
আর একটা কথা মনে রেখো, নারীজাতি কারো স্ত্রী, কারো মা, কারো বোন। তোমাদের মা, বোন ও স্ত্রীদের সঙ্গে যদি কেউ অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করে, তোমাদের যেমন মন্দ লাগে, তদ্রূপ তোমরা যখন অন্যের স্ত্রী, মা, বোনদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়াও, তখন তাদেরও মন্দ লাগে।
অতএব সাবধান, তোমরা অবৈধ সম্পর্ক তথা জিনা থেকে বিরত থাকো। আর যদি না থাকো, তোমাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হবে। তোমরা সময়ের আগে অবৈধ পথে তোমাদের যৌবনশক্তি নষ্ট করো না। সময়কালে ঠিকই পস্তাবে, কী ভুল করেছিলে।”
এরপর তিনি বললেন, “একটা কবিতা বলি তোমাদের, ‘যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার দেখবি না আর নিশিতে প্রদীপবাতি।’
এই কবিতার অর্থ হলো, দিনের বেলা যদি অহেতুক মোমবাতি পুড়িয়ে ফেলো, তবে রাতের বেলা অন্ধকারে থাকতে হবে। তেমনি তোমাদের এই যৌবন, অসময়ে নষ্ট করে ফেললে সময়মতো তা আর ফিরে পাবে না।
এরপর আরও চমৎকার সব নীতিকথা ইমাম সাহেব শুনান। তারপর তিনি নামাজ পড়ান।
নামাজ শেষে সাইফুল ইসলাম সাহেব চৌধুরী বাড়ির দুইজন উত্তরসূরির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তারা হলেন সৈয়দ ছাদিক আহমদ চৌধুরী ও সৈয়দ খলিল আহমদ চৌধুরী।
তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, মসজিদটি এখনও চৌধুরী বাড়ির লোকজনের দ্বারাই পরিচালিত হয়। মসজিদের গায়ে লিখিত আছে, মসজিদটি ১৭৪৪ সালে স্থাপিত হয় এবং ২০০৪ সালে পুনঃসংস্কার করা হয়।
মসজিদের পাশেই ছোট একটি বাংলোর মতো ঘর আছে। সেই ঘরটি বেশ পুরোনো। ঘরটির সামনে একটি পিলারে মার্বেল পাথরে লিখিত আছে, “দালান মসজিদ বাংলো, প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সৈয়দ ওয়াসিল আলী, তৎকালীন বর্ধমানের প্রধান বিচারপতি।”
অন্য পিলারে লিখিত আছে, “বাড়ি প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মীর সৈয়দ হাফিজ আলী। স্থাপিত আনুমানিক ১৭৪৪ ইং। পুনঃসংস্কার: সৈয়দ শাহ কামাল, সৈয়দ মওসুফ আহমদ গং।”
তারপর আমরা সৈয়দ ছাদিক আহমদ চৌধুরী ও সৈয়দ খলিল আহমদ চৌধুরী, এই দুজনকে সঙ্গে নিয়ে আরও কিছু ফটোসেশন করি।
চৌধুরীদ্বয় কথাবার্তায় খুব আন্তরিক ও অহংকারহীন মানুষ। তাদের ব্যবহারেই বোঝা যায়, তাদের পূর্বপুরুষ হযরত শাহজালাল এর ৩৬০ আউলিয়ার সফরসঙ্গী ছিলেন এবং এই ঐতিহ্য তারা এখনও হৃদয়ে ধারণ করেন।
তারা আমাদের চৌধুরী বাড়ির মসজিদ ও পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখান। এরপর আমরা তিনজন বাড়ির ভেতর ও বাহিরে আরও কিছু ছবি তুলে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিই।

চৌধুরী বাড়ি সম্পর্কে একটু বর্ণনা দিতে হলে বলতে হয়, ঢুকতেই বিশাল আকৃতির একটি গেইট চোখে পড়ে। গেইটের গায়ে কিছু লেখা রয়েছে, যা বাড়িটির প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
গেইটের ভেতর প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখে পড়ে একটি দৃষ্টিনন্দন পুকুর। পুকুরের পাড়ে সুন্দর, ছিমছাম ছোট একটি মসজিদ। মসজিদের পাশেই রয়েছে পারিবারিক কবরস্থান। তারপর পুকুরপাড় ধরে একেবারে শেষ মাথায় অজুখানা।
সব মিলিয়ে পুরো চৌধুরী বাড়িটিতে এক ধরনের ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতার আবহ ছড়িয়ে আছে।
আমরা চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হয়ে মাগুরা নদীর ওপর ছোট একটি ব্রিজ পাড়ি দিই। এরপর ওয়াজেদ সাহেবকে ফোন দিই। তিনি বলেন, “আপনারা সিএনজি অথবা অটোরিকশায় চলে আসেন দাওরাই বাজার।” আমরা সেখানে কোনো রিজার্ভ সিএনজি বা অটো, টমটম না পেয়ে লোকাল টমটমে উঠি। এরপর সেই টমটমে দাওরাই বাজার পৌঁছাই।

পৌঁছাতেই দেখা মিলে ওয়াজেদ সাহেবের সঙ্গে। তিনি আমাদের রিসিভ করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। তাঁর বাড়িতে পৌঁছাতে আমাদের তিনটা বেজে যায়। পথিমধ্যে তিনি দাওরাই গ্রাম ও জনপদ সম্পর্কে নানান তথ্য দেন।
আমরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসি। আমাদের জন্য মোটামুটি বেশ কয়েক পদের তরকারি রান্না করা হয়েছিল। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকায় আমরা বেশ মজা করেই দুপুরের মধ্যাহ্নভোজ পর্ব শেষ করি।
এরপর আমরা ওয়াজেদ সাহেবের বাড়ি থেকে আলোচনা করতে করতে পায়ে হেঁটে আলোয়া খালের তীরে পৌঁছাই। নামে খাল হলেও দেখতে নদীর মতো প্রশস্ত ও গভীর। খালের ওপর নির্মিত আছে নয়নমোহনীয় একটি বাঁশের সেতু। সেই সেতু পাড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে যাই দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর দাওরাই গ্রামে, যেখানে তিনি বসতি স্থাপন করেছিলেন।
বসতিস্থানটি বাউন্ডারি করা, তবে বেশ জীর্ণ ও শীর্ণ। বাউন্ডারি প্রাচীরের চার কর্ণারে ভাঙাচোরা ফাটল রয়েছে। সেই বাউন্ডারির ভেতরে পাঁচ-ছয়টি গাছ চোখে পড়ে। এর মধ্যে দুটি আমগাছ, একটি লেবুগাছ, দুটি কাঁঠালগাছ রয়েছে। তবে একটি বিশেষ গাছও রয়েছে। তার নাম আম্বল তাজ বৃক্ষ। গাছটি দেখে মনে হলো, এটি মারা গেছে।

ওয়াজেদ সাহেবের মতে, আম্বল তাজ বৃক্ষটির গোড়া থেকে উপরের অংশ পর্যন্ত মৃত অবস্থায় কয়েকশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মোকামের সামনের অংশে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) নামীয় আউলিয়ার নামসহ আরও কিছু লেখা আছে, যা অস্পষ্ট বাংলায় উৎকীর্ণ।
আমি ওয়াজেদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করি, “এটি মোকাম, না মাজার?”
উত্তরে ওয়াজেদ সাহেব জানান, “এটি মোকাম। মোকাম ও মাজার এক নয়, যদিও অনেক জায়গায় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। মাজার বলতে সাধারণত কোনো পীর-আউলিয়া বা সম্মানিত ব্যক্তির কবরকেন্দ্রিক সমাধিস্থল বোঝায়। আর মোকাম শব্দের অর্থ অবস্থান, আবাসস্থল, স্মৃতিবিজড়িত বা আধ্যাত্মিক স্থান, যা সবসময় কবর নাও হতে পারে। তবে আমাদের দেশে ওলী-আউলিয়ার বসবাস, ইবাদত বা স্মৃতির সঙ্গে জড়িত স্থানকেই সাধারণত মোকাম বলা হয়। তাই সহজভাবে, যেখানে কবর আছে তা মাজার, আর যেখানে তাঁর অবস্থান বা স্মৃতি আছে তা মোকাম। তবে অনেক ক্ষেত্রে মাজারের চারপাশের পুরো পবিত্র স্থানকেও মোকাম বলা হয়। সে অর্থে বর্তমান বড় ফেচী মৌজায় অবস্থিত সেই পবিত্র স্থানটিকে মোকাম ও মাজার, দুটিই বলা যথার্থ।
হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর দাওরাই গ্রামে অবস্থিত স্থানটি মোকাম, আর বড় ফেচী মৌজায় অবস্থিত স্থানটি মাজার ও মোকাম।”

তারপর তিনি বলেন, মনির উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর পিতা আব্দুল বারী চৌধুরী এবং তারানাথ নামীয় লেখকগণ স্থানীয় পর্যায়ে জগন্নাথপুরের বিকৃত ইতিহাস রচনা করেন। আউলিয়াগণের সঠিক ইতিহাস বিকৃত হওয়ার মূলে রয়েছে তাঁদের লিখিত ও মুদ্রিত গ্রন্থসমূহ। মনির উদ্দিন চৌধুরী তাঁর সম্পাদনায় “শাহ হাফেজ ফছিহ” নামক একটি ভূয়া গ্রন্থ রচনা করেন ১৯৯৬ সালে। তখন থেকেই এই দরগাহ হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) নামীয় আউলিয়ার ছিল বলে ইতিহাস গ্রন্থ ও গেইট ফলকে লিখিত প্রমাণ দেখা যায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার আজ শাহ হাফেজ ফছিহ (রহ.)-এর মাজার নামে পরিচিত। হযরত দাওর বখশ খতিব (রহ.) যে স্থানে বসতি স্থাপন করেছিলেন, সেই স্থানের (মোকামের) আশেপাশের বাড়িঘরগুলোতে তাঁর অধস্তন বংশধরগণ, অর্থাৎ ওয়াজেদ সাহেবের ভাই-ভাতিজারা, বর্তমানে বসবাস করছেন।
এই বাড়িতেই ওয়াজেদ সাহেবের পিতা-পিতামহরা প্রথমে বসবাস করতেন। লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পরবর্তীতে জায়গা সংকুল না হওয়ায় তাঁরা দাওরাই গ্রামের অন্য দিকে গিয়ে ঘর বাঁধেন, রত্নাংভরা নদীর পাশে। জগন্নাথপুরের আশারকান্দি ইউনিয়নের দাওরাই, আটঘর গ্রাম এবং তার আশপাশের পুরো এলাকা দুলালী, সুনাইত্যা, সিক সুনাইত্যা ইত্যাদি বিভিন্ন পরগণায় অবস্থিত।
দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মোকাম বাড়িতে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন গবেষক এএসএম ওয়াজেদ সাহেবের ছাত্র, কবি সাদিকুর রহমান রুমেন। তারপর আমরা হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার ও মোকাম দেখতে রওয়ানা দিই।

হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মোকাম বা বসতিস্থল থেকে বের হয়ে আমরা দু-চারটি নান্দনিক পাকা ঘর অতিক্রম করে মূল সড়কে আসি। সেখানে একটি চমৎকার মসজিদ, পুকুর ও কবরস্থান চোখে পড়ে। মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই ডানপাশে পুকুর এবং বাম পাশে কবরস্থান। মসজিদের ঠিক পেছনেই রয়েছে রত্নাংভরা নদী।
এ সময় আছরের আজান পড়ে যায়। আমরা পাঁচজন সেই মসজিদে আছরের নামাজ আদায় করি। তারপর মসজিদ থেকে বের হয়ে মসজিদ, পুকুর, কবরস্থান ও নদীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করি এবং ভাবতে থাকি হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) সম্পর্কে।
সেই সুদূর আফগানিস্তান থেকে তিনি নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এবং হযরত শেখ শাহজালাল (রহ.)-কে ভালোবেসে আমাদের এই অঞ্চলে এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। আজ আমাদের পুরো সুনামগঞ্জ অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। যদি ১৩০২ সালে এই মহান দরবেশের আগমন না ঘটত, তবে কী হতো এই জনপদের?
আল্লাহর কাছে মহান শুকরিয়া, যিনি আমাদের এই অঞ্চলে মহান দরবেশদের পাঠিয়ে ইসলামের অমীয় বাণী প্রচার করেছেন।

পথে যেতে যেতে ওয়াজেদ সাহেব জানান, কীভাবে দাওরাই গ্রাম তথা মৌজার নামকরণ হয়েছে। তিনি বলেন, বড় ফেচী মৌজায় অবস্থিত ঈদগাহ সংলগ্ন মাজার, ঈদগাহ ও পুকুরটি হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন।
সুদূর অতীতে যমুনা নদীতীরবর্তী একটি স্থানে হিন্দু পণ্ডিতসমাজের তীর্থকেন্দ্র ছিল। হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) ছিলেন সুমধুর কণ্ঠের বক্তা। তিনি ওই স্থানসংলগ্ন একটি ধর্মসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তাঁর কোরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি ও মর্মস্পর্শী বাণী শ্রবণ করে ‘রাই’ নামক এক হিন্দু সম্ভ্রান্ত, বিবাহযোগ্য যুবতী নারী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দরবেশ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-কে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
দরবেশ নব্য মুসলিম নারীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাকে বিয়ে করেন। বৈবাহিক অবস্থায় হযরত শেখ শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে সেখানেই তাঁদের সর্বপ্রথম বসতি স্থাপনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে দরবেশ হযরত শেখ শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশেই তাঁরা বর্তমান জগন্নাথপুর উপজেলার একটি স্থানে আগমন করে টিলাসদৃশ স্থানে বসতি স্থাপন করেন এবং ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করেন। আর সেই স্থানের নাম, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) ও তাঁর প্রাণপ্রিয় অর্ধাঙ্গিনী রাইয়ের নামে “দাওরাই” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

লোকশ্রুতি আছে, হযরত দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর “দাও” এবং যুবতী রাইয়ের “রাই” থেকে এই গ্রাম তথা মৌজা বা বসতি স্থানের নাম হয়েছে। কথিত আছে, মুসলমান হওয়ার পূর্বে ‘রাই’ নামধারী এই হিন্দু নারী ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ যোগিনী, যিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্রিটিশ বেনিয়াদের নির্দেশে ১৮৬১ সালের থ্যাক নকশায় দরবেশ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর আবাসস্থল দাওরাই গ্রাম তথা মৌজার নাম “দাসরাই” লেখা হয়। পরবর্তীতে পুনরায় এই বিকৃত “দাসরাই” নাম বাদ দিয়ে মুসলমানগণ পূর্বের “দাওরাই” নাম বহাল রাখেন। কথিত আছে, এটি ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা, যা স্থানীয় মানুষদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতনতার প্রমাণ।

কথা বলতে বলতে আমরা হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বসতিস্থল পেছনে ফেলে দুলালী পরগণায় অবস্থিত চমৎকার, দৃষ্টিনন্দন বানাইয়া হাওরের পাশ দিয়ে কিছুদূর পায়ে হেঁটে অগ্রসর হই। এক অদ্ভুত শান্তি পাচ্ছিলাম, পূর্বপুরুষদের মাটিতে পা রেখে। তারপর টমটমে উঠে বড় ফেচী মৌজাস্থিত হযরত শাহ ফছিহ্ (রহ.)-এর মাজারে পৌঁছাই।
মাজারের গেইট ফলকের ডানপাশে লিখিত আছে,
“হযরত শাহ ফছিহ্ (রহ.)
মাজার শরীফ
মোকাম বড় ফেচী, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।”
অন্যদিকে বাম পাশেও একটি ফলক ছিল। চতুর্ভুজ আকৃতির ফাঁকা স্থান দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল, হয়তো সেই ফলকটি পরবর্তীতে কেউ সরিয়ে নিয়েছে।

কবি ও গবেষক এএসএম ওয়াজেদ সাহেবের মতে, হযরত শাহ ফছিহ্ (রহ.)-এর এই মাজারই এসএ রেকর্ডের আগে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার ছিল। এসএ রেকর্ডের সময় বড় ফেচী গ্রামের কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তাদের গ্রামের সম্মান বাড়াতে ও সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে হযরত দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর নাম বাদ দিয়ে হযরত শাহ ফছিহ্ (রহ.)-এর নাম এসএ রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করেন।
কবি সাদিকুর রহমান রুমেন জানান, “এটাই হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর আসল মাজার। এই কথা শুধু আমাদের মুখের কথা নয়, বিভিন্ন প্রাচীন বইতেও এই স্থানে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার ছিল, তা স্পষ্টভাবে লিখিত আছে। হযরত শাহ ফছিহ্ (রহ.)-এর নামে ফেচী গ্রামের মানুষজন ২০০৯ সালে মাজার তৈরি করেন। ওয়াজেদ স্যারের মোকদ্দমা করার পরপরই তারা প্রথম গেইটের বামপাশের সাল ও তারিখ লিখিত ফলকটি সরিয়ে নেয় এবং দ্বিতীয় গেইটে লিখিত মাজার সৃষ্টির তারিখ ও সাল মুছে দেয়। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে আমরা ঠিকই ছবি তুলে রেখেছি। আমরা আশাবাদী, মোকদ্দমার রায় হলে আমাদের জয় নিশ্চিত।”

আসলে আকাশে চাঁদ উঠলে যেমন চাঁদ ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি সত্যকেও আড়াল করা যায় না। মাজার পরিদর্শন শেষে প্রিয় সংবাদকর্মী ও কলামিস্ট রাহমান তৈয়বের সঞ্চালনায় ফেসবুক লাইভে চলে যাই। হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মাজার সম্পর্কে এক ঘণ্টার লাইভ কর্মসূচি চলে। এরপর আমরা সবাই মাজার জিয়ারত করি।
মাজার, ঈদগাহ ও পুকুর পরিদর্শনে আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বসতিস্থলে যে আম্বল তাজ বৃক্ষ দেখেছিলাম, এখানেও সেই আম্বল তাজ বৃক্ষ রয়েছে। কী অদ্ভুত মিল! পার্থক্য শুধু এটুকুই, মাজারের বৃক্ষটি সতেজ, সবুজ পাতায় পরিপূর্ণ, আর বসতিস্থলের বৃক্ষটি পাতাহীন।
এই গাছের অনেক গুণাগুণ আছে; এটি চমৎকার একটি ওষুধি গাছ।

ওয়াজেদ সাহেব আমাকে আরএস মাঠ পরচা ও খতিয়ান রেকর্ডের কাগজ দেখিয়ে বলেন, “দেখুন, আরএস মাঠ পরচা ও খতিয়ান রেকর্ডে দরগাহ হিসেবে কোনো আউলিয়ার নাম উল্লেখ নেই। মূলত এই তিনটি পরচার জমি থেকে আউলিয়ার প্রকৃত বংশধরদের বঞ্চিত করা হয়েছে। খতিয়ান প্রস্তুতের সময় বক্তার খা, আলম খা ও চান্দ খা বংশধররা নও মুসলিম ও কন্যা সন্তানের সূত্রে উত্তরাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এখন যদি এই তিনটি পরচার প্রিন্ট কপি আইনিভাবে আদালতে দাখিল করা যায়, তাহলে সরকারি উদ্যোগে ‘হযরত শেখ দরগাহ দাওর বখশ খতিব’ হিসেবে জমি উদ্ধারের চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে।”
ডিপি আরএস দাগ নং ১৫৯৬, এসএ খতিয়ান ৪৩/০ এবং এসএ দাগ ১৮০৭ অনুযায়ী জমির শ্রেণি ‘দরগাহ’ হিসেবে উল্লেখ আছে। ফাইনাল ১নং খতিয়ানেও একই শ্রেণি রয়েছে। কিন্তু আরএস রেকর্ডের সময় সেখানে ‘শাহ হাফেজ ফসিহ’ নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য যে সঠিক ইতিহাস ও দলিল থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় প্রকৃত সত্য যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, আমরা টমটমে উঠি। পথিমধ্যে একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করি। পুনরায় টমটমে চড়ে দাওরাই গ্রামে, দরবেশ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর মোকামের কাছাকাছি আসি। সেখান থেকে সন্ধ্যা-রাতের আলো-আঁধারে হাঁটতে থাকি আমরা পাঁচজন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বাঁশের সেতুতে উঠি। হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে মাঝেমধ্যে খালের ওপর বাঁশের সাঁকোর দেখা মিললেও বাঁশের সেতুর দেখা খুব কম মেলে। সুনামগঞ্জ জেলায় আমার দেখা এটিই বাঁশের তৈরি সর্ববৃহৎ সেতু। রাতের আলো-আঁধারে কিছু ছবি তুলি আমরা। এরপর সেতু পার হয়ে কবি ও গবেষক এএসএম ওয়াজেদ সাহেবের বাড়িতে আসি।
বাড়িটি কোন মৌজায় পড়েছে, তা জিজ্ঞেস করলে জানানো হয়, “বর্তমান বাড়ি জামার গাও মৌজা, প্রকাশিত দাওরাই গ্রাম।” এর অর্থ হলো, এখন যে জায়গার নাম জামার গাও (গ্রাম বা মৌজা), আগে সেই জায়গাটি দাওরাই গ্রাম নামে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ প্রাচীন সেই দাওরাই গ্রাম তখন সিক সোনাইত্যা পরগণার অন্তর্গত ছিল।

ওয়াজেদ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আপনার ও আমার আলোচ্য লেখার ভিত্তি হলো দলিলগত তথ্য। সেই দলিল অনুযায়ী, দাওরাই গ্রাম কিসমত আতুয়াজান, সিক সুনাইতা, হাওলি সোনাইতা ও দুলালী এই চারটি পরগনার ভূমির মধ্যে অবস্থিত।”
তারপর সেখান থেকে দ্রুত চা পানি খেয়ে আমরা দাওরাই বাজারে আসি। দুর্গম এলাকা হওয়ায় দাওরাই থেকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা অনেক দূরে। বেশি রাত হয়ে গেলে বাস বা সিএনজি কোনোটি পাওয়া যাবে না। তবে এএসএম ওয়াজেদ সাহেবের অতিথি আপ্যায়নে আমরা সত্যিই মুগ্ধ। রাহমান তৈয়ব ও নূরুল হুদা সাহেব বারবার তাঁর প্রশংসা করছিলেন, কারণ তাঁর এলাকায় যাওয়ার পর আমাদের সব পরিবহন খরচ তিনিই বহন করেছেন; আমাদের কিছুই খরচ করতে দেননি। তিনি বলেছিলেন, রাতে থাকলে অনেক পুরোনো ডকুমেন্টস তিনি আমাদের দেখাতেন। সময়ের স্বল্পতার কারণে আমরা থাকতে পারিনি।
দাওরাই বাজারে এসে কবি আবু কয়সর ভাইয়ের দোকানে প্রবেশ করি। সেখানে আসতেই তিনি আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন, করমর্দন করেন, চা আপ্যায়ন করান এবং কিছু বই উপহার দেন। আমরা সবাই সেই বই হাতে নিয়ে ফটোসেশন করি। তারপর বিদায় নিয়ে চলে আসি কবি সাদিকুর রহমান রুমেন ভাইয়ের অফিসে। সেখানে আসার পর তিনি আমাদের আরও কয়েকটি বই উপহার দেন। তার মধ্যে একটি বই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যা আমার দাওরাই জনপদ নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগবে। সেখানেও আমরা সবাই ছবির ফ্রেমে বন্দী হই।

ওয়াজেদ সাহেবের মতে, যখন এই অঞ্চলের কোনো নাম ছিল না এবং নিম্নভূমিজুড়ে শুধু জল আর জল ছিল, আর উচ্চভূমি সব বনজঙ্গলে ঘেরা ছিল, তখন হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই স্থানের একটি টিলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। এই টিলাই দাওরাই টিলা নামে পরিচিতি লাভ করে। ইসলাম প্রচারের ফলে একসময় তাঁর নামানুসারে শুধু টিলা নয়, পুরো জনপদের নাম দাওরাই জনপদ হয়।
এ কথা বলেই এএসএম ওয়াজেদ আমাকে “প্রাচীন বাংলার মানচিত্র” নামে একটি মানচিত্র দেখান। সেই মানচিত্রে শ্রীহট্টের দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুপুর জঙ্গল, একই সমান্তরালে আরও দক্ষিণ-পশ্চিমে আসফপুর, সুবর্ণগ্রাম ও বিক্রমপুর উল্লেখ আছে। আবার ওই মানচিত্রে শ্রীহট্টের উত্তর-পশ্চিমে গারো পাহাড়, উত্তরে খাসিয়া পাহাড় এবং উত্তর-পূর্বে জয়ন্তিয়া পাহাড় দেখা যায়। জয়ন্তিয়ার উত্তরে গৌহাটি লেখা রয়েছে। গৌহাটির উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ (লোহিত্য) প্রবাহিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর-পশ্চিমে গোয়ালপাড়া, উত্তরে কামরূপ এবং উত্তর-পূর্বে প্রাগজ্যোতিষ লেখা রয়েছে। তবে ওই মানচিত্রে সুনামগঞ্জ তথা লাউড় রাজ্যের কোনো উপস্থিতি ছিল না। হয়তো সে সময়ে “লাউড়” নামে কোনো স্বতন্ত্র রাজ্য বা অঞ্চলের অস্তিত্ব ছিল না।
পরবর্তীতে গবেষক এএসএম ওয়াজেদ তাঁর “মধ্যযুগের বাংলা (সুলতানি আমল)” সময়ের আরেকটি মানচিত্র উপস্থাপন করেন। সেই মানচিত্রে শ্রীহট্টের উত্তর-পশ্চিমে লাউড় ও সুসাঙ্গ এবং পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ লিখিত রয়েছে। নদীটি শ্রীহট্টের উত্তর দিক থেকে শুরু হয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
এরপর তিনি মোগল আমলের ১৬৬০ সালের “শ্রীহট্টের মানচিত্র” নামে আরেকটি মানচিত্র দেখান। সেই মানচিত্রে লাউড়, সুনামগঞ্জ, জয়ন্তিয়া, বানিয়াচং, জগন্নাথপুর, তরফ, প্রতাপগড়, বংশীকুণ্ডা, ধর্মপাশা, বেতাল, কুবাজপুর, দুলালী, দিরাই ইত্যাদি বহু স্থানের নাম দেখতে পাওয়া যায়।

গবেষক এএসএম ওয়াজেদ কর্তৃক উল্লিখিত বিভিন্ন সময়ের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মানচিত্র তিনটি বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন শ্রীহট্ট অঞ্চলের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পরিবর্তনশীল চিত্র পাওয়া যায়। এসব মানচিত্রে একই ভূখণ্ডকে ভিন্ন ভিন্ন সময় ও প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীন বাংলার ভূরাজনীতি ছিল ক্রমবিবর্তনশীল।
প্রাচীন বাংলার মানচিত্রে শ্রীহট্ট অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুপুর জঙ্গল, আসফপুর, সুবর্ণগ্রাম ও বিক্রমপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদের নাম পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সুনামগঞ্জ অঞ্চল বা লাউড় নামটি সেখানে স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি থেকে ধারণা করা যায় যে তখন এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি পৃথক কোনো সুপরিচিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ে সুসংগঠিত ছিল না; বরং এটি বৃহত্তর জনপদের প্রান্তিক অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতো।

পরবর্তীকালের মধ্যযুগীয় (সুলতানি আমলের) মানচিত্রে শ্রীহট্টের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে লাউড় ও সুসাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে উঠে আসে। এই পর্যায় থেকে বোঝা যায় যে, লাউড় অঞ্চল ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র জনপদ বা ক্ষুদ্র রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। অর্থাৎ বর্তমান সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ঐতিহাসিক পরিচয় এই সময় থেকেই পৃথকভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে এবং লাউড় নামের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয় গড়ে ওঠে।
এরপর মুঘল আমলের প্রায় ১৬৬০ সালের শ্রীহট্টের মানচিত্রে লাউড়, সুনামগঞ্জ, জয়ন্তিয়া, বানিয়াচং, জগন্নাথপুর, তরফ, প্রতাপগড়, বংশীকুণ্ডা, ধর্মপাশা, দিরাইসহ বিভিন্ন স্থানের ও পরগণার নাম সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে তখন এই অঞ্চলটি আরও সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি স্থান নির্দিষ্ট পরিচয়ে পরিচালিত হতো।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য স্পষ্ট হয় যে, সময়ের সাথে সাথে একই ভূখণ্ডের নাম, সীমানা ও প্রশাসনিক পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রাচীন দাওরাই জনপদের বিস্তীর্ণ জলাভূমি অঞ্চল থেকেই পরবর্তীতে লাউড় রাজ্যের উদ্ভব ঘটে, যা আনুমানিক চতুর্দশ শতকের শেষভাগের দিকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করে। পরবর্তীতে মুঘল আমলে এসে এই অঞ্চল বিভিন্ন পরগণায় বিভক্ত হয়ে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে তোলে।
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, সুলতানি শাসনামলে পরগনা শব্দটির সর্বপ্রথম প্রচলন ঘটে। সে সময় সুলতানদের অধীনে একগুচ্ছ গ্রাম মিলে একটি পরগনা গঠিত হতো। শেরশাহ সূরির আমলে, অর্থাৎ সুলতানি ধারার শেষভাগে, শেরশাহ সূরি পরগণার প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করেন, যেখানে শিকদার, আমিন ও কারকুন যুক্ত হয়।
সে সময় পরগনা একটি প্রশাসনিক ও রাজস্ব একক হিসেবে সুলতানি আমলে শুরু হলেও এটি সুসংগঠিত রূপ পায় মুঘল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫)। আকবরের রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাসহ উপমহাদেশে ভূমি জরিপ ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে সাজিয়ে সরকার, পরগনা ও মহল কাঠামো স্পষ্টভাবে চালু করেন। এই সময় থেকেই পরগনা প্রশাসনের স্বীকৃত একক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
উল্লিখিত তথ্যের আলোকে পরগনা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায়, পরগনার ধারণা শুরু হয় সুলতানি আমলে, শেরশাহের সময় শক্তিশালী হয় এবং আকবরের সময় পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।

এএসএম ওয়াজেদের বিশ্লেষিত মানচিত্রসমূহ থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মানচিত্রগুলো আজকের মতো নির্দিষ্ট জেলা-ভিত্তিক সীমানা উপস্থাপন করত না। তখন মানচিত্রে রাজ্য, জনপদ, নদী, পাহাড় ও গুরুত্বপূর্ণ বসতি অঞ্চলকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে একই অঞ্চল বিভিন্ন যুগে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও ভিন্ন বিস্তৃতিতে চিহ্নিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শ্রীহট্ট ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ছিল এক পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিসর, যেখানে লাউড় ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের পরিচয় ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। প্রাচীন মানচিত্রে অনুপস্থিত থাকলেও পরবর্তীকালে তা সুস্পষ্টভাবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা শ্রীহট্টের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনেরই আধুনিক ফলাফল।
দাওরাই জনপদের সীমানা কতটুকু জিজ্ঞেস করলে এএসএম ওয়াজেদ সাহেব জানান, “কসবা সিলেট ও কিত্তা সিলেট” নামতত্ত্ব থেকে বোঝা যায় যে, সিলেট একসময় একটি প্রশাসনিক সরকার বা শাসনকেন্দ্র ছিল।
এখানে কসবা সিলেট ছিল মূল কেন্দ্র, আর কিত্তা সিলেট ছিল সেই কেন্দ্রের চারপাশের সুরক্ষাবলয় বা সীমান্ত এলাকা। এই কিত্তা সিলেটের সীমানা থেকেই ধারণা করা যায়, এটি প্রাচীন দাওরাই জনপদ বা রাজ্যের বিস্তৃত ভূখণ্ডের অংশ ছিল। কিছু দলিলসূত্রে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায় যে, এই অঞ্চল একসময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার অধীনে নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হতো।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে সুলতানি আমলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে অঞ্চলটি বিভিন্ন পরগনায় বিভক্ত হয়ে যায়। তখন পূর্বদিকে বর্তমান বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও নবীগঞ্জ এলাকার ভূমি এবং পশ্চিমদিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডের সঙ্গে এর সম্পর্ক অনুমান করা যায়।
এছাড়া হবিগঞ্জ, বানিয়াচং, জাতুয়া, বর্তমান জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ এবং সুসাঙ্গ পরগনার নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু দলিলও পাওয়া যায়।

তবে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো স্পষ্ট লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ বা নির্ভরযোগ্য সূত্র চোখে পড়েনি, যেখানে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই কারণেই আমি দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের কাছে বিনম্র আহ্বান জানিয়ে আসছি, বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
আমরা যারা ইতিহাস নিয়ে চর্চা করি, তারা সবাই কমবেশি অবগত আছি যে, বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ-এর সময়ে সুবে বাংলাকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করা হয়। এই ১৩ চাকলার মধ্য শিলহাট দ্বাদশ স্থানীয় ছিল। এর একটি চাকলা ছিল শিলহাট। এসময় সিলেটের নাম ছিল শিলহাট। সেই শিলহাটকে আবার ১০টি রাজস্ব জেলায় ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ৭ নম্বর রাজস্ব জেলা ছিল রসূলগঞ্জ। এই রসূলগঞ্জ পড়েছে বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায়।

 

এএসএম ওয়াজেদ সাহেবের ভাষ্যমতে, উপরোক্ত রাজস্ব জেলার বহুকাল পূর্বে অত্র অঞ্চলে একটি মাত্র পরগণা ছিল, যার নাম ছিল আতুয়াজান। এই আতুয়াজান ছিলেন একজন সম্মানিত নারী, যার নামে দাওরাই জনপদে প্রথম পরগণার সৃষ্টি হয়। তিনি এ অঞ্চলে আতুয়াজান বিবি নামে সুপরিচিত ছিলেন। এই নারী হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর উত্তরসূরীদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
১৬৬২ সালের প্রাচীন ভূমি সনদ পাঠে জানা যায়, উক্ত পরগণাটি সুলতানি আমলে সৃষ্ট। পরবর্তী সময়ে এই আতুয়াজান পরগণা থেকে চারটি পরগণা, কিসমত আতুয়াজান, সিক সোনাইতা, হাওলি সোনাইতা এবং দুলালী, খারিজ হয়ে বর্তমান জগন্নাথপুর তথা সুনামগঞ্জ, বালাগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও দিরাই অঞ্চলে বিভিন্ন পরগণার সৃষ্টি হয়। যেমন লখনছিরি (লক্ষ্মণ চিরি), মাহারাম, পলাশ, চামতলা ও বেতাল প্রভৃতি।
পরগণাগুলো কখন সৃষ্টি হয়েছিল এবং একই সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিসমত আতুয়াজান, দুলালী, সোনাইতা, সিক সোনাইতা এবং হাওলি সোনাইতা সবগুলো একই সময়ে সৃষ্টি হয়নি। কিসমত আতুয়াজান পরগণা তুলনামূলকভাবে পরবর্তী সময়ে, আনুমানিক ১৭৯০ সালের দিকে, তালুক হিসেবে গঠিত বলে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে দুলালী পরগণার অস্তিত্ব ১৬৯৯ সালের একটি ভূমি দলিলে পাওয়া যায়, যা এটিকে আরও প্রাচীন হিসেবে নির্দেশ করে।
আবার আতুয়াজান জনপদের উল্লেখ সুলতানি আমল থেকেই পাওয়া যায় এবং ১৬৬২ সালের একটি ভূমি সনদেও এর চিহ্ন দেখা যায়। অন্যদিকে সোনাইতা, সিক সোনাইতা এবং হাওলি সোনাইতা অঞ্চলগুলো মুঘল সুবেদার শাহ সুজার সময়কার প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং মজকোর তালুক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, এগুলো একই সময়ে গঠিত হয়নি। বরং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়পর্বে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা ভিন্ন ভিন্ন জনপদ ও পরগণার নাম।

তিনি আরও জানান, সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ মুসলিম, যাদের পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত মুসলিম নন, তাঁদের অনেকেই হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর উত্তরসূরি বলে লোককাহিনি প্রচলিত আছে এবং দলিলপত্রেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সুনামগঞ্জ নামকরণের ক্ষেত্রেও দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন পুরুষ শেখ সুনাম উদ্দিন-এর নামের উল্লেখ করেন।
শুধু তাই নয়, শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে সুনাম উদ্দিন পর্যন্ত একটি প্রাচীন বংশতালিকাও তিনি সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যা সত্যিই অত্যন্ত দুর্লভ। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ নামকরণ ও সুনাম উদ্দিন সম্পর্কে অচ্যুত চরণ চৌধুরী, আবু আলী সাজ্জাদ হোসেন, সামারিন দেওয়ান ও ফারুকুর রহমান চৌধুরীর প্রদত্ত কিছু মতকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় মতভেদের সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মণছিরি পরগণার রহমতনগরে বসবাসরত রহমত আলি (তাং), যিনি ২৪৬০৯ নং মহালের (১১ নং তালুক) দশসনা বন্দোবস্তকারী (১৭৮৯), তিনিও হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন পুরুষ। শুধু তাই নয়, দশসনা বন্দোবস্তের বক্তার খাঁ, বাহাদুর খাঁ, গোলাম আলি, মোহাম্মদ লায়েক ও মোহাম্মদ আমির-এরা সকলেই দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন পুরুষ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর পূর্ব নির্দেশ অনুসারে দাওরাই জনপদের বিভিন্ন পরগণার নানা তালুকস্থানে তাঁর অধস্তন পুরুষেরা বসতি স্থাপন করেন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এসব ঐতিহাসিক কথাবার্তা শেষে আমরা কবি সাদিকুর রহমান রুমেন ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে টমটমে করে সৈয়দপুরে আসি। এই পর্যন্ত কবি ও গবেষক এস. এম. ওয়াজেদ সাহেব আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি চাইলে তাঁর বাড়ি থেকেই আমাদের বিদায় দিতে পারতেন, কিন্তু তাঁর আন্তরিকতা এতটাই বেশি ছিল যে তিনি নিজেই আমাদের সৈয়দপুর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান।
তারপর আমরা সেখান থেকে সিএনজি যোগে জগন্নাথপুর বাজারে আসি। এরপর সেখান থেকে সিএনজি করে সুনামগঞ্জ পৌঁছাই। রাহমান তৈয়ব নেমে যান শান্তিগঞ্জ উপজেলায়, আর আমরা দুজন সুনামগঞ্জ সদরের ওয়েজখালি বাজারে নামতে বাধ্য হই। সিএনজি চালক আর যেতে পারছিল না; সে গ্যাস পাম্প থেকে সিএনজিতে গ্যাস নেবে। আমরা সিএনজি চালকের কাছ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে সিএনজি থেকে নেমে পড়ি।
এখানে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে। পেরেশানিতে পড়ে যাই, আমার উপহার পাওয়া বইয়ের ব্যাগ ভুলে সিএনজিতে রেখে চলে আসি, পুলিশ লাইনের কাছাকাছি। হঠাৎ মনে পড়ে, সিএনজিতে ব্যাগ রেখে এসেছি। তারপর নূরুল হুদা সাহেবকে বলি, “আপনি বাসস্ট্যান্ডে যান, আমি ব্যাগটা নিয়ে আসছি।” অনেক খুঁজাখুঁজির পর ব্যাগ পাই, এবং নূরুল হুদা সাহেবও বালিঝুড়ি যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যান। আমরা দুজন যার যার গন্তব্যস্থলে চলে যাই।
শেষ হয় আমাদের এক দিনের দাওরাই সফর।
লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102