
◑শেখ একেএম জাকারিয়া
ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের মতো নির্মম ঘটনা বারবার সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়। তাই ধর্ষণের শাস্তি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের ভাটিয়ারি এলাকায় ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৭০ বছর বয়সী মো. ইউসুফকে স্থানীয়রা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। (সূত্র: ইত্তেফাক)। এছাড়া, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে মাত্র ৬ বছরের এক শিশুকে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়, যার ফলে শিশুটির বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং পরদিন মৃত্যুবরণ করেন। (সূত্র: প্রথম আলো)। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায়ও ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে, যা প্রমাণ করে যে সুরক্ষিত এলাকাও এখন নিরাপদ নয়। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। এই ঘটনা প্রমাণ করে, দেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তির জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ রয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। তবে বাস্তবে দেখা যায়, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয়, অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থের জোরে পার পেয়ে যায়, ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় ভিকটিমের পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে মামলা করতেও সাহস পায় না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠবে, যা সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তাই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের প্রতি সম্মান ও সমানাধিকারের গুরুত্ব শিশুদের শেখাতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা ও লিঙ্গসমতা বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নারীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সর্বত্র সিসিটিভি স্থাপনের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হলে সমাজে এই অপরাধের হার কমবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে এই অপরাধ থামানো সম্ভব নয়। এজন্য দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত—একটি ধর্ষণমুক্ত, নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক: সভাপতি, সুনামগঞ্জ সাহিত্য সংসদ গণপাঠাগার