মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত মহা অষ্টমীতে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও অনুদান বিতরণ করলেন ইউপি চেয়ারম্যান কামাল নকলায় এসবিসি প্রকল্পের এমএনসিএএইচ বিষয়ে জনসংলাপ

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে আলোচিত নারী মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার, বেরিয়ে আসছে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া আন্তর্জাতিক চক্রের ভয়ঙ্কর তথ্য

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯৮ বার পড়া হয়েছে
১৬৯

মোঃরফিকুল ইসলাম সোহাগ সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
ইউরোপের দেশ ইতালিতে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম প্রধান দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানা-পুলিশের একটি চৌকস দল সিলেটের শাহপরাণ থানা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ওই নারী ও তার ভাইকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দায়ের করা অন্তত চারটি মামলার দীর্ঘদিন ধরে পলাতক আসামি ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইছাকপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছা. শোবি বেগম (৩০) এবং তার ভাই শামছুল (২৮)। জগন্নাথপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট মামলা থাকার পর থেকে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে, এই ভয়ংকর আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের পলাতক সদস্যরা সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ থানা এলাকায় আত্মগোপন করে আছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে জগন্নাথপুর থানার এসআই মতিউর রহমান, এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, এসআই অনিক পাল এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিনসহ পুলিশের একটি চৌকস দল শাহপরাণ থানা-পুলিশের সহায়তায় এক যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করে।
এদিকে এই আন্তর্জাতিক চক্রের মূলহোতাদের গ্রেপ্তারের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘদিন আতঙ্কে মুখ না খোলা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একে একে সামনে আসতে শুরু করেছেন। তাদের সাথে ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক প্রতারণা, সীমাহীন শারীরিক নির্যাতন ও সর্বস্ব হারানোর করুণ কাহিনী প্রকাশ পাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি মূলত তিন দেশ থেকে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। শোবি বেগমের স্বামী প্রবাসী মেশকার মিয়া অবস্থান করছেন ইতালিতে। এছাড়া প্রবাসে থাকা তার দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন ইতালিতে এবং অপরজন লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। ইতালিতে থাকা স্বামী মেশকার মিয়া ও ইতালিপ্রবাসী ভাইয়ের পাশাপাশি লিবিয়ায় থাকা অপর ভাই আন্তর্জাতিক এই পাচার সিন্ডিকেটের মূল নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বাংলাদেশে অবস্থানরত শোবি বেগম ও তার ভাই শামছুল স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামের সহজ-সরল ও বেকার যুবকদের সরাসরি ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলতেন এবং ধাপে ধাপে কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশে টাকা নেওয়ার পর শুরু হতো প্রতারক চক্রটির আসল অমানবিক খেলা। স্বপ্নের দেশ ইউরোপ বা ইতালিতে সরাসরি পাঠানোর কথা বলে ভুক্তভোগীদের প্রথমে বিমান কিংবা বিকল্প পথে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় পাঠাত চক্রটি। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর শোবি বেগমের ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাফিয়া চক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগীদের বিমানবন্দরে নেমেই অপহরণ করত। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হতো মরুভূমির ভেতরের গহীন টর্চার সেল, গুম ঘর বা গোপন মাফিয়া ক্যাম্পে। সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হতো নারকীয় নির্যাতন। সশস্ত্র পাহারায় আটকে রেখে দিনকে দিন খাবার ও পানি না দিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট দেওয়া হতো। লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলা, পিঠে ও গায়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে শারীরিক নির্যাতন চালানো ছিল তাদের নিত্যদিনের চিত্র।
প্রতিদিন এই নারকীয় নির্যাতন চালানোর সময় ভুক্তভোগীদের আর্তচিৎকার ও কান্না মোবাইল ফোনে অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড করা হতো। পরবর্তীতে সেই হৃদয়বিদারক ভিডিও ফুটেজ বাংলাদেশে থাকা ভুক্তভোগীদের স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দাবিকৃত মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হতো। সন্তানদের বিদেশে আটকে রেখে মারধর ও মেরে ফেলার ভয় দেখালে ভিটেমাটি, শেষ সম্বল কিংবা বসতবাড়ি বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে স্বজনেরা প্রবাসে থাকা চক্রের কাছে ও দেশে শোবি বেগমের হাতে কোটি কোটি টাকার মুক্তিপণ তুলে দিতে বাধ্য হতেন।
প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ভুক্তভোগী সইফুল মিয়া তার করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, চক্রটি তাকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে শোবি বেগম ও তার ভাইয়ের সিন্ডিকেট বিভিন্ন দফায় তার কাছ থেকে নগদ ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিদেশে পাঠানোর পর তাকে লিবিয়ার মাফিয়া ক্যাম্পে বন্দি রেখে আরও বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় এবং অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।
একই প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার হওয়া কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা আরেক ভুক্তভোগী আবু তাহের মিয়া অভিযোগ করে জানান, তার ছেলে বিন আমিনকে ইতালি পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারক চক্রটি তাদের কাছ থেকে নগদ ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পরবর্তীতে তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
একই চক্রের ভয়ংকর ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের জহুর আলীর ছেলে সেলিম। তিনি জানান, ইউরোপে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে চক্রটি তাকে আক্ষরিক অর্থেই পথের ফকির বানিয়ে দিয়েছে। চক্রটি তাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে মোট ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। টাকা নেওয়ার পর লিবিয়ার মাফিয়া ক্যাম্পে বন্দি রেখে তার ওপর চালানো হয়েছে ভয়াবহ নির্যাতন।
এছাড়া একই চক্রের শিকার হয়েছেন এলাক মিয়ার মেয়ের জামাই এমরান হোসেন আদিল। ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকেও বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে লিবিয়ার মাফিয়া ক্যাম্পে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। চক্রটির এমন নির্মম ফাঁদে পড়ে পুরো সুনামগঞ্জের অসংখ্য পরিবার আজ তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব ও দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।
গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করলেও ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী এখন কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। তাদের সুস্পষ্ট দাবি, গ্রেপ্তারকৃত শোবি বেগম ও তার ভাই শামছুলকে আদালতে হাজির করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিতে হবে। পুলিশি রিমান্ডের মাধ্যমেই এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের পেছনে থাকা দেশের ভেতরের ও বাইরের সব মূলহোতার নাম এবং আসল সত্য উন্মোচিত হবে। একই সাথে লিবিয়ার বিভিন্ন টর্চার সেলে ও মাফিয়া ক্যাম্পে এখনো যেসব অসহায় যুবক বন্দি হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে সরকারি ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে জীবিত উদ্ধারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন স্বজনেরা। এছাড়া নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো যাতে তাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ ও আত্মসাৎকৃত কোটি কোটি টাকা ফেরত পায়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের আইনগত ও দৃষ্টান্তমূলক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই নূর হোসেন জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ ও মানবপাচার নিরোধ আইনের সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের রিমান্ড আবেদনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধ ও আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। লিবিয়া ও ইতালিতে অবস্থানরত চক্রের অন্য সদস্যদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশের এই অলআউট সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102