
মো. জাহাঙ্গীর আলম
কখনো কখনো প্রযুক্তির আশীর্বাদ যে অভিশাপে পরিণত হতে পারে, তা হয়তো আমরা নিজেরাই টের পাই না— কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করি। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ— এসব যেন আজকের দিনের যুবসমাজের ছায়াসঙ্গী। সকালবেলা চোখ খোলার আগে আমরা হাত বাড়াই মোবাইলের দিকে, আর রাতে ঘুমোবার আগেও চোখের পাতার চেয়েও আপন হয় স্ক্রিনের আলো। এই নেশার নাম— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
আমি নিজেই দেখেছি, এমন কত তরুণ শিক্ষার্থী আছে যারা বইয়ের পাতা না উল্টিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে “রিলস” দেখে, “স্টোরি” দেয়, কিংবা “রিঅ্যাক্ট” করে চলেছে অবিরাম। সময় যেন ঘড়ির কাঁটার মতো নয়, স্ক্রলের ফিডের মতো চলে যাচ্ছে— শেষ নেই, সীমা নেই।
কিন্তু এই আসক্তির পিছনে কী হারাচ্ছি আমরা?
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে আমাদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগে। একাগ্রতা হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ বই খুলেই মোবাইলের টানে ফিরে যাচ্ছে। শিক্ষার পবিত্রতাকে গিলে ফেলছে ডিজিটাল বিকর্ষণ। আগেকার দিনে যেখানে ছাত্রেরা লাইব্রেরিতে সময় কাটাতো, এখন তারা কাটায় ইনবক্সে, ইনস্টাগ্রামে। প্রশ্ন আসে, এই প্রজন্ম কি তবে স্মার্ট হচ্ছে, না স্মার্টফোনের দাসে পরিণত হচ্ছে?
শুধু পড়ালেখার ক্ষতিই নয়— এই আসক্তি মননশীলতাকেও ক্ষয় করে। চিন্তার বিস্তার, ভাষার সৌন্দর্য, কল্পনার ডানা— সব কিছুই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে কিছু সেকেন্ডের ভিডিও আর নিঃসার কনটেন্টে। মেধা হারাচ্ছে তার দীপ্তি, শিক্ষা হারাচ্ছে তার গন্তব্য।
তবে দোষ কি শুধু প্রযুক্তির? না।
আসক্তি তখনই বিষ হয়ে দাঁড়ায়, যখন আমরা নিয়ন্ত্রণ হারাই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকলে, এগুলো হতে পারে শিক্ষারও সহায়ক। কিন্তু যখন ছাত্রজীবনের অমূল্য সময় এর পিছনে অপচয় হয়, তখন সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।
আমার বিশ্বাস, এখনো সময় আছে—
যদি আমরা সচেতন হই,
যদি আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি প্রয়োজন অনুযায়ী,
যদি আমরা মনুষ্যত্ব আর মনোযোগকে ফিরিয়ে আনি আমাদের পড়াশোনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
জ্ঞানচর্চা হোক মুখ্য, আর প্রযুক্তি হোক সহায়ক।
তবেই আমরা ফিরে পাবো সেই আলোকিত শিক্ষা, যার আলো নিঃশব্দে মুছে দিতে পারবে এই আসক্তির অন্ধকার।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, ধনপুর আছমত আলী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়,বিশ্বম্ভরপুর,সুনামগঞ্জ