
সুনাম দিগন্ত ডেস্ক:
উএসকো পীস এওয়ার্ড ২০২৬-এর ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান)’ ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়েছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর বাজার হাজী গণি বক্স উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হোসাইন আহমেদ। শিক্ষার্থীদের বিকাশ, শাস্তিমুক্ত ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি এবং বিদ্যালয়ের ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার পাশাপাশি নারী ক্রীড়াবিদদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক উৎসাহ ও সহযোগিতার বিষয়টিও তাঁর জীবনযাত্রার উল্লেখযোগ্য দিক।
হোসাইন আহমেদ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ঢালাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০১৫ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ২০১৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০২০ সালে বগুড়া বিপিএড কলেজ থেকে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে বিপিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা’ কর্মসূচিতে কাজ করেন। সেখানে নিরাপদ অভিবাসন, পুনঃএকত্রীকরণ ও মানবপাচার প্রতিরোধবিষয়ক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া ইউনিসেফের নারী ও শিশু বিষয়ক একটি প্রকল্পেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
হোসাইন আহমেদ শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময়, মানবিক ও ভীতিমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেন। শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে ইতিবাচক আচরণ, উৎসাহ ও সৃজনশীল পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখানোর পক্ষে তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন হোসাইন আহমেদ। শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, খেলাধুলা, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে কাজ করছেন তিনি।
২০২৬ সালের ৫৪তম শীতকালীন আন্তঃস্কুল উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় জয়নগর বাজার হাজী গণি বক্স উচ্চ বিদ্যালয়ের ভলিবল দল চ্যাম্পিয়ন হয়। একই প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়টি বিভিন্ন ইভেন্টে মোট ১০টি পুরস্কার অর্জন করে। তাঁর মতে, খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
একজন শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে হোসাইন আহমেদ খেলাধুলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। পরিবারের সদস্য হিসেবেও ছোট বোনের ক্রীড়াযাত্রায় তাঁর সমর্থন নারী খেলোয়াড়দের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। হাওরাঞ্চলের একটি গ্রামের মেয়ের জাতীয় নারী হকি দলে জায়গা করে নেওয়ার ঘটনা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্য মেয়েদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।
উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ পরিবেশ, নিয়মিত অনুশীলন এবং পরিবারের সহযোগিতা পেলে গ্রামের মেয়েরাও খেলাধুলায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে। হোসাইন আহমেদের পারিবারিক অভিজ্ঞতা এ সম্ভাবনার কথাই সামনে আনে।
হোসাইন আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঢালাগাঁও গ্রামের প্রথম স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও বিপিএড ডিগ্রিধারী। পাশাপাশি গ্রাম থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া প্রথম ব্যক্তি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়া এবং পরিবারের একজন সদস্যের জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ তাঁর জীবনযাত্রার দুটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিক্ষা ও ক্রীড়ার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আগামী ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে উএসকো পীস এওয়ার্ড ২০২৬-এর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে হোসাইন আহমেদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
আয়োজনে দেশের খ্যাতিমান তারকা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, চিকিৎসক, ইনফ্লুয়েন্সার, শিক্ষক, সংগঠক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, সমাজসেবী এবং আইটি, এনজিও ও জনপ্রশাসন খাতের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রকৌশল, সমাজসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, এনজিও কার্যক্রম, জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হবে।
আয়োজক রাকিব আলী জানান, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখা ব্যক্তি ও পেশাজীবীদের সম্মানিত করা এবং তাঁদের কাজের মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন হোসাইন আহমেদের পেশাগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। ভবিষ্যতে মানসম্মত ও আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ, ক্রীড়াচর্চার প্রসার এবং গ্রামীণ মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যাশা তাঁর। তিনি চান, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে যে পেশাতেই যুক্ত হোক না কেন, সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। পাশাপাশি গ্রামের মেয়েরাও যেনো নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায় এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরতে পারে।