
বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের কোনো না কোনোভাবে ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভূমি-সংক্রান্ত মৌলিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, নামজারি বা খারিজ, দাখিলা, ভূমি উন্নয়ন কর কিংবা জমির মাপজোক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা রাখেন না। সামান্য একটি ভূমি-সংক্রান্ত কাজেও তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে সাধারণ কোনো বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘ভূমি শিক্ষা’ নামে একটি অধ্যায় সংযোজন করা জরুরি। এই অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের ভূমির মৌলিক ধারণার পাশাপাশি CS, SA, RS, BS/BRS খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা, নকশা, নামজারি বা খারিজ, জমির দলিল, পর্চা, দাখিলা, ভূমি উন্নয়ন কর এবং জমির মাপজোক সম্পর্কে সহজ ও ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়া যেতে পারে। শতক, কাঠা, বিঘা, একর ইত্যাদি প্রচলিত এককের পাশাপাশি জমির পরিমাণ নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতিও শেখানো প্রয়োজন।
শুধু বইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করানো নয়, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন, একটি নমুনা খতিয়ান দেখে দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ শনাক্ত করা, নকশা থেকে জমির অবস্থান বোঝা, দাখিলার বিভিন্ন তথ্য চেনা, জমির মাপ হিসাব করা এবং নামজারি ও ভূমি কর প্রদানের মৌলিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
এর সুফল শুধু শিক্ষার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন শিক্ষার্থী যখন ভূমি বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করবে, তখন সেই জ্ঞান তার পরিবারেও ছড়িয়ে পড়বে। অর্থাৎ একটি পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় ধীরে ধীরে প্রতিটি পরিবারে ভূমি-সচেতনতা তৈরি করতে পারে।
আমাদের দেশে ভূমি নিয়ে বিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি, প্রতারণা ও অপ্রয়োজনীয় দালালনির্ভরতার পেছনে সাধারণ মানুষের ভূমি-সংক্রান্ত জ্ঞানের ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ভূমি বিষয়ে সচেতন করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের জমি ও সম্পত্তির মৌলিক তথ্য বুঝতে এবং ছোটখাটো ভূমি-সংক্রান্ত কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
বর্তমানে ভূমি সেবার অনেক কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও ডিজিটাল ভূমি সেবা সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা দেওয়া সময়ের দাবি। এতে তারা ভবিষ্যতে নিজের ও পরিবারের ভূমি-সংক্রান্ত কাজে আরও সচেতনভাবে অংশ নিতে পারবে।
শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বাস্তব জীবনের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করা। ভূমি যেহেতু আমাদের জীবন, পরিবার, অর্থনীতি ও সম্পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই ভূমি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞানও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একটি অধ্যায় হয়তো একটি শিক্ষার্থীর জ্ঞান বাড়াবে, কিন্তু সেই জ্ঞান যখন ঘরে ঘরে পৌঁছাবে, তখন তৈরি হবে একটি ভূমি-সচেতন প্রজন্ম ও সচেতন সমাজ।
তাই ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে ভূমি বিষয়ক একটি সহজ, বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী অধ্যায় সংযোজনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।
-মো. মোশারফ হোসাইন
নকলা, শেরপুর।
E-mail: musharaf9ab@gmail.com