শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
নকলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্থায়ী ভবন না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি নকলায় সিজি সদস্যদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন ও কর্মপরিকল্পনা তৈরী সভা নকলায় সার বিতরণ ব্যবস্থাপনাসহ কৃষি বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন ইবতেদায়ী শিক্ষার্থীদের জন্যও চালু করা হোক মিড-ডে মিল শান্তিগঞ্জে ‘আমার সংস্কৃতি, আমার অহংকার’ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ প্রবাসী জুলাই যোদ্ধা আলী আহমদের পরিবারের পাশে বিএনপি-যুবদল নেতারা দাসপাড়ায় গভীর রাতে যুবদল নেতা জসিমের বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা নকলায় শতভাগ উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দীপনা পুরষ্কার প্রদান ভূমি-সচেতন প্রজন্ম গড়তে পাঠ্যবইয়ে ভূমিশিক্ষা অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের অনিবার্য দাবি নকলায় সোমবার রাত থেকে নিখোঁজ ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সন্ধ্যা

যে রাতে পানি উঠল ঘরে::কামরুজ্জামান কামরান

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯৮ বার পড়া হয়েছে
২৩৬

সাল ২০২২ এর মে মাসের ১৫ তারিখ রবিবার থেকেই সুনামগঞ্জে ছোটখাটো বন্যার আভাস। টানা বৃষ্টি, উজানে পাহাড়ি ঢলে হাওর ভরে টানের দিকে চলে আসছে পানি। ধোপাজান নদীটা ভরে গেছে যদিও তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে বাঁধ দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু কিছু জায়গায় জমির মালিকদের বিরোধিতায় বাঁধ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তা নিয়ে মানুষের মনে বিরাজ করছিল অনেক চিন্তা।

আসলে আমাদের একটা জাতিগত সমস্যা আছে, তা হলো ভবিষ্যতের লাভ-লোকসান নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই। আমরা দেখি সাময়িকের চাকচিক্য আর তার কারণেই আমাদের এতো দুর্দশা।

যাইহোক এভাবেই দিনের পর দিন যাচ্ছে, বন্যার পানিও বাড়ে কমে। কিন্তু জুন মাসের ১২ তারিখ রবিবার থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি কমছেই না ফলে পুরো সিলেটে নেমে আসলো প্রকৃতির দুর্যোগ বন্যা। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছিল কিভাবে নদী ভাঙনে চলে যাচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু। ছোট্ট নিষ্পাপকে বাঁচানোর আর উপায় না পেয়ে ডেকচিতে করে ভাসিয়ে দিচ্ছে জনক-জননীরা। মানুষের হাহাকার দেখা যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এইতো সব শেষ আর রইলো না কিছুই বাকি!

আমাদের বাড়িটা অবস্থিত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর বালুচর হাটিতে তবে আমাদের বাড়িটা ধরা যায় সৈয়দপুর এবং কৃষ্ণনগরের বর্ডার রূপে। বালুচর ধরাটাও মুশকিল হতো যদি না আমাদের চলাফেরা বালুচরের দিকে থাকত।

আমাদের বাড়ির পূর্ব থেকেও শুরু হয়েছে ভাটি অঞ্চলের মতো নিচু জায়গা। যে কয়েকটা বাড়ি আছে ১৫ই জুন বুধবার সবার ঘরেই পানি উঠে গেছে। তখন বন্যার ভয়াবহতা আর মোবাইল ফোনে দেখা লাগে না, বাড়ির পূর্বদিকে কয়েকটা বাড়ির দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে সৈয়দপুর পূর্বপাড়াও পানির নিচে চলে গেছে ততক্ষণে। যেহেতু আমাদের বাড়ি মাঠের মধ্যে তাই মনে হচ্ছিল আমরা ক্যারাভানের কোনো দ্বীপে বাস করছি। চতুর্দিকে জলাশয়, মাঝখানে আমরা শুকনোতে দাঁড়িয়ে। প্রতি বছরই বন্যা হয় তবে মনে এতো ভয় আসে না কারণ কোনো সময়ই আমাদের বাড়িতে পানি ওঠেনি। আমাদের জন্য সিচুয়েশনটা ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেলো ১৬ই জুন বৃহস্পতিবার সকাল দশটার দিকে বাড়ির উঠোনে চিপ চিপ করে বন্যার পানির আগমন হয়ে গেলো। অন্যদিকে সেই ১৩ তারিখ থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি থামার কোনো প্রয়োজনবোধ করছে না হয়তো। আমাদের সবারই ধারণা হয়ে গেল এবার কিছু একটা অঘটন হবে। আমরা ৩ ভাই বাড়িতে ওঠা পানি নিয়ে একজন আরেকজনের সাথে মজা করছিলাম, অন্যদিকে সবার মনেই ছিল ভয়। আমি তখনও মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত ভিডিও করাতে। বাড়িতে পানি উঠেছে স্মৃতি হিসেবে রাখবো বলে। কিন্তু পরবর্তী ভয়াবহতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

রাত হলো, সবাই ভাত খেয়ে ঘুম দিয়েছি। আব্বা বলল সবাই একটু সতর্ক থাকিস, মনে হয় না বৃষ্টি থামবে আর যেহেতু উঠানে পানি তাই ঘরেও চলে আসতে পারে। তখনও ঘরে উঠতে আরো দেড়-দুই হাত পানি বৃদ্ধির প্রয়োজন। সবাই ঘুমিয়ে গেলাম। ভোর রাতে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো। দেখি আমাদের খাটের নিচে পানি চলে এসেছে। সবাই দ্রুত উঠে ঘরের যা যা জিনিসপত্র আছে উপরে উঠাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অন্যদিকে কৃষক পরিবার হওয়ায় ঘরে গোলা ভর্তি এবং বস্তায় থাকা কয়েক মণ ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা লেগে গেছে। আউস মৌসুমের চারা ধানও তো পানির নিচে, মনে হয় না পচে যাওয়া থেকে মুক্তি পাবে। তাই আব্বা আর বড় ভাই ব্যস্ত ধান এবং চালগুলো নিরাপদ জায়গায় রাখতে। গ্রামে ধান রাখার জন্য ঘরের একটা কোণে বাঁশ বা অন্য কিছু দিয়ে একটি মাচার মতো বানানো হয় যাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলে উগার। তো আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। উগারের মধ্যে সমস্ত বস্তা তুলে প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে খুব ভালোভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যেন পানি না লাগে বস্তা এবং গোলাতে।

সকাল সাতটা-সাড়ে সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম পানি কমে কি না কিন্তু পানি কমার বিপরীতে বেড়েই চলছে। ততক্ষণে ঘরের পুরোটা অংশই পানিতে ভিজে গেছে পায়ের পাতা সমান। বোঝা গেল পানি ভয়াবহ রূপ নেবে এই বছর। ৩ বছরের ছোট্ট বোন নিয়ে মা যদি পানিতে বেশিক্ষণ থাকে তাহলে তো সমস্যা, তাই বাইরে যাওয়া হলো কারো কোনো নৌকা পাওয়া যায় কিনা দেখার জন্য। কিন্তু আমাদের থেকে প্রতিবেশীদের আরো ভয়াবহ অবস্থা। পাশের বাড়ি থেকে ৪-৬ বছরের দুইটা শিশুর চিৎকারের শব্দ আসছে আমাদের কানে। আমাদের নৌকা নেই, ঠিক তাদেরও একই অবস্থা। যাদের ডিঙি আছে তারা ব্যস্ত নিজেদের অবস্থা নিয়েই।

এমন অবস্থায় দেখা গেল জলিলকে। জলিল হলো কৃষ্ণনগর দক্ষিণ পাড়ার ফুল মিয়া সাহেবের ছেলে। আব্বা তাকে ডাক দিল কিন্তু তার অন্যমনস্কতা বা বৃষ্টির কারণে শুনতে পায়নি। আব্বার স্বর জুড়ে কয়েকটা ডাকের পর বেশ দূর থেকে জলিল দ্রুত ছুটে আসলো আব্বার কাছে। তখন আব্বা তাকে বলল পাশের বাড়ির বাছির মিয়ার পরিবারকে আম্বর আলী মামাদের বাড়িতে দিয়ে আসতে। তখনও আম্বর আলী মামাদের ঘর এবং জলিলদের ঘরে পানি ওঠেনি তবে ছুঁই ছুঁই। সে সঙ্গে সঙ্গে গেল বাছির মিয়ার বাড়িতে এবং তারই আত্মীয়ের পরিবারকে দিতে গেল নিরাপদ স্থানে। সে যখন সেখানে গেল তাকে সবাই ঘিরে ধরেছে বিভিন্ন জায়গাতে যেতে আর এই দিকে আমরাও দুশ্চিন্তায়, কোনো বাহন নেই উঁচু স্থানে যাওয়ার।

আমি তখন গরুর ঘর আর আমাদের ঘরে আসতে যেতে ভিজে গেছি। গরুর ঘরে পানি উঠে গিয়েছিল বৃহস্পতিবারেই। সারাটা রাত ধরে গরুগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আমি দেখলাম গরুদের পা কাঁপছে আর সহ্য করতে পারছে না তারা। ঘরে বিভিন্ন পোকামাকড় ঢুকছে, সাপও দেখলাম দুইটা। খবরটা পৌঁছালাম বড় ভাই এবং আব্বার কাছে। তখন উনারা বললেন আরো কিছুক্ষণ দেখে তারপর দেখা যাবে কি করা যায়।

এরপর জলিলের ফিরে আসতে দেরি হচ্ছে দেখে আমি সাঁতার কাটতে শুরু করলাম আম্বর আলী মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে। দেড়শ থেকে দুইশ শতাংশ জায়গার দূরত্বে এমন ঝুঁকি নেওয়া মোটেই উচিত হয়নি। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমার পা মাটি ছুঁয়েছিল এবং ঠাঁই পেয়েছিলাম তাই বেশি কষ্ট হয়নি।

জলিলকে গিয়ে আনলাম মা, ছোট ভাই আর বুধবারে সৈয়দপুর পূর্বপাড়া থেকে আসা দুই কাজিনকে নানা বাড়িতে পৌঁছে দিতে। বিপদ-আপদে সবার আগে স্থান একটাই, নানা বাড়ি। জলিলের মাকে গিয়ে আনল কারণ তারাও ঐদিকে যাবে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে কিছু ধান আছে এগুলো রাখা যায় কি না জেনে আসার জন্য, কারণ বিগত দিন থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ডিজিটাল যোগাযোগ বন্ধ।

আমিও তাদের সাথে চলছি বড় সাইজের ডিঙিতে করে। নানা বাড়িতে গিয়ে দেখি উনাদের উঠানে পানি উঠতে তখনও বেশ বাকি তবে পুকুরপাড় তলিয়ে যাবে এমন সম্ভাবনা প্রখর। সবাই প্রস্তুত হচ্ছে পুকুরপাড়ে জাল দিয়ে চাষের মাছগুলোকে বন্যা থেকে বাঁচাতে।

সবাইকে রেখে জলিল ছুটে চলল তার আপন কাজে, সঙ্গে আমি আর তার মা। তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে ধান রাখা যাবে। এরপর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি। সৈয়দপুর মোড়ল বাড়ি থেকে আসার পথে একসময়ের এলাকার জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ নাদের শাহ সাহেবের বাড়ির পূর্ব-উত্তরে আমার নানা একটা খাল খনন করেছিল ভেকু দিয়ে। যখন এখানে আসলাম, ছুটলো তুমুল বেগের ঝড়। একেকটা বৃষ্টির ফোঁটা যেন শরীর ভেদ করে বের হবে অন্য পাশ দিয়ে। পানির ঢেউ দেখে মনে হচ্ছিল উত্তাল সাগরের মধ্যে আমরা ছোট্ট এক গাছের টুকরা ধরে ভেসে বেড়াচ্ছি। জলিলের মা পড়তে লাগলো “লা ইলাহা ইল্লা আনতা” বার বার, এইটুকুই। এমন বিপদে উনি সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। আমারও তো একই অবস্থা। জলিল তার দেহের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিয়ে একেকবার বৈঠা, একেকবার লম্বা বাঁশ দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এমন সব ঢেউ আসছিল যা দেখে আমার মতো অন্যরা সবাই ভেবে ফেলত হয়তো এখনই আমার অন্তিম মুহূর্ত।

জলিলের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা পৌঁছালাম আমাদের বাড়িতে। সে আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তার বাড়িতে। সকাল থেকে সে মানবসেবা করছে তবে তার বাড়িতেও তো বিপদ। ততক্ষণে তাদের ঘরের বারান্দাতেও পানি। ঘরে তার মুমূর্ষু বাবা।

আমি বাড়িতে যতক্ষণে পৌঁছেছি ততক্ষণে ঝড়টা শেষ, ঢেউও বন্ধ হয়েছে। বাড়িতে নেমে দেখলাম বাড়ির দক্ষিণের সব লেবু গাছগুলো নুয়ে গেছে। বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করার পর বলল কিছুক্ষণ আগের ঢেউগুলো নাকি এই ১০-১৫ ফুট উচ্চতার লেবু গাছের ওপর দিয়ে গিয়েছে। ঝড়ের সময় আমার অবস্থানের কথা বর্ণনা করার পর আব্বা এবং ভাই কতবার যে খোদার শুকরিয়া আদায় করেছে, গণনাহীন।

ততক্ষণে দশটার উপরে বেজে গেছে। চতুর্দিক থেকে হাহাকারের প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে। মানুষজন একে অপরকে ডেকে বলছে নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। বোঝার বাকি রইলো না, যেইদিকে নদীর বাঁধ দিতে দেওয়া হয়নি সেইদিকেই এই অঘটন ঘটেছে। পানি তো আরো বেশি হবে। আমাদের গরু ছিল তখন ছোট-বড় সব মিলিয়ে দশটা। এগুলোর কি পরিণতি হবে। ঠিক তখনই কাইয়ারগাঁও থেকে বড় এক ট্রলার নিয়ে এসেছে আমাদের বাড়ির উত্তরের বাড়িতে তাদের গরু নিয়ে যাওয়ার জন্য। দেশি দুইটা গরু আর দুইজন মানুষ নৌকায় উঠবে এটা দেখে আব্বা বলল গরু জোড়া দেওয়ার জন্য। বড় ভাই দ্রুত জোড়া দিল। উদ্দেশ্য ছিল তাদের তো দুইটাই গরু, এর সাথে যদি আমাদের বড় গরুগুলো নিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ির সোজা পশ্চিমে নানা বাড়িতে নামিয়ে দেওয়া হয়, এরপরে না হয় ছোট বাছুরগুলোকে নেওয়া যাবে অন্য কোনো উপায়ে।

যখন ট্রলারটা আমাদের বাড়ির পথের সামনে দিয়ে যাচ্ছে আমরা অনেক ডাকাডাকি করলাম আমাদের গরুগুলো নিয়ে যেতে। তারা ডাক শুনলো, আমাদের দিকে তাকালো কিন্তু নেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। এইদিকে সকাল থেকে বৃষ্টিতে এবং বন্যার ঠান্ডা পানিতে ভিজে আমার অবস্থা নাজেহাল। এটা দেখে আব্বা বলল, “তুই বড় গরুগুলো নিয়ে যা, হাঁটা শুরু কর।” কারণ বড় গরু আমাকেও টেনে নিতে পারবে কিন্তু ছোটগুলোকে উপরে করে নিতে হবে। আর আমরা যেহেতু তিনজন ছিলাম, দশটা গরু নেওয়া সম্ভবও ছিল না।

গরু কোনো বড় ব্যাপার ছিল না কিন্তু যে অবস্থা ছিল, বাড়িতে থাকার মতো না। একেতো চতুর্দিকে পানি, তার মধ্যে একটু পর পর সাপের আগমন। সকাল থেকে অনাহার। আর আব্বার সবচেয়ে বড় টেনশনের কারণ আমি। বয়সটা তখন মাত্র ১৫ বছর। কাঁপতে ছিলাম। ঝড়ের সময়কার ভয়ংকর অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে দিয়েছিলাম। আমি বার বার ক্ষুধার কথা বলছিলাম। তাই এতো তাড়াহুড়া। এরপর সাহস করে আমি গরুর রশি ধরে টান দিয়ে যেতে শুরু করলাম কিন্তু নদী ভাঙনের পর যে পানি আসছিল তার স্রোতে গরু উল্টো দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করল, আমার পক্ষে রাখা অসম্ভব। বড় ভাই দ্রুত রশিটা ধরলেন এরপর তিনি নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন গন্তব্য নানা বাড়ির উদ্দেশ্যে।

একটু সামনের দিকে যাওয়ার পর পানির তীব্রতা আর ভয়ংকর নদীর পানির স্রোতে দেখতে পেলাম আমার বড় ভাই একবার পানির নিচে যায় আবার উপরে উঠে। আব্বা গলা ভেঙে ডাকতে লাগলো, “তুই নিজে গিয়ে টানে উঠ, গরু ছেড়ে দে। গরু যে দিকে যাওয়ার যাক। তুই টানে ওঠ।” বাবারা হয়তো এমনই। কোনো প্রকার সম্পদের মায়া করে না। সন্তানই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

বড় ভাই গরু ছাড়ে না। অসীম সাহস নিয়ে ছুটে চলছে। তিনি গিয়ে টানে উঠলেন কোমর সমান পানি কিন্তু বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছে ততক্ষণে।

মামারা তখন পুকুরপাড়ে জাল দিতে ব্যস্ত। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন ভাইয়ের দিকে। মেজো মামা নিজের সখের মাছের চিন্তা ফেলে রেখে ছুটে চলে আসলেন ভাইয়ের কাছে। ভাইসহ গরুগুলো উনাদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমাদের কথা জিজ্ঞেস করার পর ভাই ভয়াবহতার কিছু অংশ বর্ণনা করলেন। তখন তিনি আবার পূর্বদিকে যাত্রীবাহী একটা ডিঙিতে চড়ে আমাদের বাড়িতে আসলেন। এসে আব্বাকে খানিকটা রাগেই বললেন যে এতক্ষণ পর্যন্ত কেন আমাদের নিয়ে এই পানিতে বসে আছে।

আব্বা পূর্ববর্তী কিছু ঘটনা বর্ণনা করলেন, বিশেষ করে উত্তরের বাড়ির ভদ্রলোকের কাজটা। আরও বললেন অপেক্ষা করছিলাম এমন আর কোনো ট্রলার বা বড় নৌকা আসে কি না।

এরপর অবশিষ্ট থাকা চারটে বাছুর থেকে মামা দুইটা নিলেন, আব্বা একটা কারণ আব্বার কাছে টাকা-পয়সাসহ আরো অনেক জিনিস। আর আমি বড় বাছুরটা নিলাম। বড় গরু পানিতে নিয়ে যাওয়ার সুবিধা তো আগে বললামই, সেই কারণেই বড় বাছুরটা আমি নিলাম। ততক্ষণে পানির স্রোত কমে গেছে। ভাই যে পথ দিয়ে গিয়েছে আমরা সেই পথ দিয়ে না গিয়ে বিকল্প পথ দিয়ে গেলাম। অনেক কষ্টের পর আমি পৌঁছালাম আমার শান্তির জায়গায়।

সারা সকালের এত কষ্টের পর যখন কষ্ট লাঘব হয়ে গেছে আমি তখন নানা বাড়ির ঘরের ভিতরে ঢুকেই কেঁদে দিয়েছিলাম, আবেগে নাকি কষ্টের তীব্রতা বোঝাতে তা জানি না। নানা অবশ্য বলল, “ব্যাটা, মানুষের ইততা কিছুই না, এইডা কোনো পানি অইলো! আগে আমরা উঠান থেকে মাছ ধরতাম!” মজা করে আমাকে হাসানোর চেষ্টায় তিনি সফলও হয়েছেন।

কিন্তু আমি কাঁপছিলাম, সারা শরীর ঠান্ডা বরফের মতো। হাতের চামড়াগুলো পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। মা এবং নানি আমাকে বলল বিছানায় যেতে। বড় ভাই ততক্ষণ সেখানে বিশ্রামে ছিল। নানি বাড়িভরা মানুষ। তো আমি বিছানায় শুলাম, নানি কিছু কাঁথা দিল আমার উপরে। কিন্তু আমার কাঁপন থামে না। এরপর আরো কাঁথা, লেপ দিল। সম্ভবত ছোট মামা এর উপরে ঝাঁপটি মেরে শুইল যেন আমার শরীর গরম হয়। আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে আমার শরীর গরম হলো। আর এই ক্লান্তি নিয়েই আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

 

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102