বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত জামালগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, অপরাধ দমনে জোর ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত

নারিকেল গাছের চূড়াতেই যেন আহালুর রুটিরুজি : কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ান জেলা থেকে জেলায়

নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি:
  • সংবাদ প্রকাশ শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯৪ বার পড়া হয়েছে
৩৪১

ভোরের আলো ফুটতেই হাতে দা, কোমরে দড়ি আর কাঁধে প্রয়োজনীয় কয়েকটি সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আহালু। দিনের গন্তব্য কখনো নকলার কোনো গ্রাম, কখনো পাশের উপজেলা, আবার কখনো জেলার সীমানা পেরিয়ে দূরের কোনো জনপদ। গন্তব্যে পৌঁছে মুহূর্তেই উঠে যান উঁচু নারিকেল গাছের মাথায়। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে যা রীতিমতো শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য, আহালুর কাছে সেটিই প্রতিদিনের কর্মজীবন। নারিকেল গাছের চূড়াই যেন তার রুটিরুজির ঠিকানা।

শেরপুরের নকলা উপজেলার গনপদ্দী ইউনিয়নের বাড়ইকান্দি গ্রামের মৃত আব্দুস ছালামের ছেলে ৪৭ বছর বয়সী আহালু। প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি পেশাদার গাছি হিসেবে নারিকেল গাছ পরিষ্কার, শুকনো ডাল অপসারণ ও পরিচর্যার কাজ করে আসছেন। জীবনের ঝুঁকি নেওয়া এই পেশাই তার পরিবারের প্রধান অবলম্বন।

আহালুর সংসারে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে। দারিদ্রতার কারনে ছেলেরা কেউ লেখাপড়ায় বেশি দূর যেতে পারেনি। বড় ছেলে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেজ ছেলে কোরআনে হাফেজ। মেজ ও ছোট ছেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকার একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সবার ছোট মেয়েটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি প্রয়োজন মেটানোর পেছনে রয়েছে আহালুর ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশার ঘাম।

আহালু জানান, প্রায় দেড়যুগ ধরে বোরো ও আমন মৌসুমে ধান রোপণ ও কাটার কাজ করেন। আর বছরের বাকি সময় নারিকেল গাছ পরিষ্কার, শুকনো ডাল অপসারণ ও পরিচর্যার কাজ করেন। তিনি বলেন ‘আগের মতো প্রতিদিন এত গাছে উঠতে পারি না। তবু মাসে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। আগে যখন শরীরে বেশি শক্তি ও সাহস ছিল, তখন মাসে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছি। শক্তি, সাহস ও সামর্থ কমে যাওয়ায় আয় দিন দিন কমছে।’

তার ভাষ্য, নকলা উপজেলার পূর্বাঞ্চলে নারিকেল গাছের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ওইসব এলাকায় কাজও বেশি মেলে। তবে এখন আর তিনি শুধু নকলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। স্থানীয় এক যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহালুর ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ছবি ও তার মোবাইল নম্বর প্রকাশ করার পরথেকে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও কাজের ডাক পান। বছরে অন্তত দুই থেকে তিন মাস জেলার বাইরে অবস্থান করে নারিকেল গাছ পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, নিজ জেলার বাহিরে কোনো এলাকায় গেলে সেখানে টানা ১০ থেকে ১২ দিন অবস্থান করে কাজ শেষ করেন। একটি গাছ পরিষ্কার করতে সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা নেন। তবে শহরাঞ্চলে বৈদ্যুতিক লাইনের পাশের কিংবা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ গাছে কাজ করলে গাছের মালিকরা স্বেচ্ছায় গাছপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকেন।

আহালুর দেয়া তথ্য মতে, নকলা উপজেলায় অন্তত ১২ থেকে ১৪ জন পেশাদার গাছি রয়েছেন। তাদের মধ্যে বাড়ইকান্দি গ্রামের কডা মিয়া, গফুর মিয়া ও ছাইফুল; গনপদ্দী ইউনিয়নের কিংকরপুর এলাকার ছাইদুল ইসলাম এবং মেদীরপাড়ার এলাকার হাকিম মিয়ার নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের সবার জীবিকার প্রধান উৎস ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশা।

স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম রেজা বলেন, ‘আহালুর সংসার ও সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য আয় সহজে আসে না। প্রতিটি গাছে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। তবু সংসারের প্রয়োজনে সেই ঝুঁকিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন অনেকে। যদিও অনেকে এই পেশার পাশাপাশি অন্য পেশাকে বেছে নিয়েছেন।”

অন্য এক সাংবাদিক নূর হোসেন জানান, আগে নারিকেল গাছ ছিলো বেশি পক্ষান্তরে গাছির সংখ্যা ছিলো কম। স্বাভাবিক কারনেই সেসময় তাদের চাহিদা বেশি ও মজুরি বেশি ছিলো। এখন গাছ কমেছে, বেড়েছে গাছির সংখ্যা। তাই চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমেছে, কমেছে তাদের আয়।’

গ্রামবাংলার এই গাছিদের জীবন খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ বাড়ির আঙিনার উঁচু নারিকেল গাছ নিরাপদ রাখা, শুকনো ডাল অপসারণ এবং ফলন ধরে রাখতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা আর কঠোর পরিশ্রমকে সঙ্গী করেই তারা প্রতিদিন গাছের চূড়ায় ওঠেন। নিচে অপেক্ষা করে থাকে পরিবার, আর ওপরে থাকে জীবিকার সন্ধান।

ভূরদী কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ্জ মো. ছায়েদুল হক জানান, আহালুর মতো নিম্ন আয়ের মানুষের এই গল্প শুধু একজন গাছির গল্প নয়; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের অসংখ্য নীরব শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, সাহস ও আত্মমর্যাদার গল্প। প্রতিটি গাছে ওঠার সঙ্গে তিনি যেন নতুন করে প্রমাণ করেন, জীবিকার জন্য মানুষের সাহস কতটা উঁচুতে পৌঁছাতে পারে। জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তারা প্রতিদিন গাছের চূড়ায় ওঠেন। সেই ঝুঁকির বিনিময়েই চলে সংসার, এগিয়ে যায় সন্তানের পড়াশোনা, টিকে থাকে একেকটি পরিবার।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, আহালুর মতো গাছিরা আছেন বলেই এখনো নারিকেল গাছ পরিষ্কার করা নিয়ে কৃষকরা চিন্তা করেন না। তানাহলে সময়মত গাছ পরিষ্কারের অভাবে ফলন কমে যেত। ফলশ্রুতিতে কৃষকরা নারিকেল গাছ রোপনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেতন। গাছিদের নিখুঁত হাতের স্পর্শে সময়মত নারিকেল গাছ যথাযথভাবে পরিষ্কারের কারনেই ফলন বাড়ছে এবং নিজেদের উৎপাদিত নারকেলে স্থানীয় চাহিদা পুরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102