
আশ্রাফুল আলম মোঃ নুরুল হুদা
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
বড়দল উচ্চ বিদ্যালয়,তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।
পৃথিবী মানেই অনেক প্রাণীর আবাসস্থল। বহুরুপী বৈচিত্র্যময় প্রাণীর বসবাস। এতে প্রতিটা প্রাণীই তার নিজ, নিজ সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে সময় কাটছে। কেউ নিজস্ব সমাজ ছাড়া অন্য কারো সমাজে ঢুকা বা হস্তক্ষেপ করা যেমন প্রকৃতির আইনে বাধা। তেমনি ঢুকলে সুবিধার বিপরীতে অসুবিধা বা বিপদঘন্টা বাজার সম্ভাবনাই বেশী।
প্রত্যেক সমাজে প্রত্যেক বসতির নিজস্ব কিছু আইন বিদ্যমান। যা অন্য সমাজের জন্য মোটেও কাম্য নয়।
সৃষ্টিজগতে স্রষ্টার অন্যতম সৃষ্টি মাছের কথাই বলি। আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী। মাছ ছাড়া আমাদের চলেই না। সকাল-সন্ধ্যা বাসায় মাছের গমণাগমন চলে। হউক জীবিত হউক মৃত। খাবারের সময় খাবার টেবিল সাজাতে হলে মাছ লাগবেই। এটা আমাদের বাঙালিদের প্রথা। এই মাছও পৃথক একটা সমাজের প্রাণী। তার বসবাস পানির ভিতর। সে জায়গায় কত রকম বা কত প্রকারের মাছের মেলা বসেছে সেটা একমাত্র সকল প্রাণীর স্রষ্টা মহান মা’বুদই ভালো জানেন।পানির স্হর, রং,গভীরতা,স্হিতি,অস্হিরতা অনুযায়ী মাছের জাতগত বসবাস। সচরাচর নালা,ডুবায় যে মাছ থাকে হয়তো সে মাছ বড় নদী বা বিলে নাও থাকতে পারে। তেমনি সাগরে যে মাছ থাকে তা সচরাচর হাওর ডুবাতে নাও থাকতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। এটা মাছের জাতগত পরিবেশের বিষয়। কোন মাছ বেশী পানিতে সুবিধাভোগ করে। আবার কোন মাছ কম পানিতে বেশি সুবিধা ভোগ করে। সে কিন্তু প্রাণী হওয়া সত্বেও সৃষ্টির অন্য প্রাণীদের সমাজে কক্ষনোই আসেনা। কোননা কোনভাবে যখনই তার সমাজের বাইরে আসে তখন তার বিপদ অবধারিত। যদি কোনভাবে বাঁচে এটা খুবই ব্যতিক্রম ঘটনা। তবে যতক্ষণ পানিতে থাকে কম পানিতেই হউক আর বেশী পানিতেই হউক সে পুরুটাই স্বাধীন এবং নিজ ক্ষমতায় বলিয়ান। যখন যেভাবে ইচ্ছা সে অবাধ বিচরণ করে।
শত-সহস্র অসংখ্য প্রাণীদের মধ্যে ছোট একটা প্রাণী ইঁদুরের কথাই ধরি।
ইঁদুরের বসবাস বেশি অংশ মাটির গর্তে বা পরিত্যক্ত নীরব কোন ব্যাগ বা বাক্সে। রাতে অন্ধকার যত গভীর হবে ইঁদুর নামক প্রাণীর ক্ষমতা বা দাপট চরম উত্তেজনায় বৃদ্ধি পাবে। ওরা তাদের ইচ্ছেমত পলিসি এ্যাপ্লাই করে। কার কী হলো ভালো মন্দের কোন আওয়াজ শুনা তাদের বিধানে নেই।
মশা নামের একটি প্রাণী তারও জাত-বংশ আছে। আছে তার মনমাতানো গানের শীষ । ইচ্ছেমতো ডানামেলে উড়ে বেড়ায়।যখন তার প্রয়োজন হয় তখন সে কারো শরীরের রক্ত নিতে দ্বিধা করেনা বা মরণের পরওয়াও করেনা। সে সর্বোচ্চ বাহাদুরি দিয়ে তার সুবিধা নিতে চায়।
সাপ বিষাক্ত ও বিপদজনক প্রাণী। তার বসবাস বন-জঙ্গল,গাছ-গাছালি মাটির গর্ত ও একেবারে পরিত্যক্ত নোংরা মানব শুন্য বাসাবাড়ি। সে এই জায়গায় তার পরিবার,পরিবেশ নিয়ে নিজ স্বাধীনতায় দিন কাটায়। স্বাভাবিক অন্য যে কোন প্রাণীই তার ক্ষমতাকে বিষাক্ত মনে করে।
কথায় আছে শিয়াল খুব চালাক প্রাণী। তার বুদ্ধির প্রশংসা যে কোন উত্তেজক কথায় উপমা দেওয়া হয়। সে জঙ্গলে তার বংশ ও চাতুরতা নিয়ে অহংবোধ করে।
ভেঙ্গুর একটা ছোট প্রাণী। যা বেশি অংশই গাছের ডালে গোলাকার হয়ে দলবদ্ধ বসবাস করে। ওরা আপনমনে নিজ আহার সংগ্রহে ব্যস্হ থাকে। কারো কাজে বা কাউকে কোন কষ্ট দিতে আগ্রহী নয়। তবে তাদের স্বাভাবিক গতিপথে কেউ বাঁধা দিলে তারা দলবদ্ধভাবে তাদের উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।
এখন সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদজনক প্রাণীর নামটা শুনি তাহলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
যা পাহাড় এলাকা বা বড় বড় বনাঞ্চলে বসবাস করে। এদের কাছে বা নিকট দূরে যারা বসবাস করে তারা ভালো করেই জানে
এই প্রাণীর জ্বালাতন কী ও কত প্রকার?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাছ পানিতে বা তার আবাসস্থলে অত্যধিক চালাক ও গতিসম্পন্ন কথা যেমন সঠিক,
তেমনি যদি কোন শিকারী তাকে পানি থেকে শুকনায় উঠায় বা অন্য কোন প্রাণীর আক্রমনে পতিত হয় তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়ায়?
ইঁদুর পরিশ্রমপ্রিয় গতিসম্পন্ন চালাক প্রাণী। তাকে ধরার আগ পর্যন্ত সে অসম্ভব গতিতে নানাপথে শক্তিমত্বা দেখায়। যখন পাঁতানো ফাঁদে সে ধরা খায় তখন তার অবস্থা কোথায় যায়?
মশা একটি ছোট প্রাণী। তাকে কেউ ভয় করেনা ঠিক, কিন্তু তার ছোট শরীর নিয়ে যদি কাউকে কামড় বসিয়ে দেয়। ঘুমন্ত মানুষ চেঁচিয়ে ওঠে।
যখন মশারীর ভিতর বা হাতের থাবায় ধরা পড়ে তখন কী হয়?
সাপ এ-তো আরো বেশী বিপদজনক,ভয়ংকর ও বিষাক্ত প্রাণী। এ থেকে সবাই অনেক দূরে নিজেকে রাখতে চায়। কিন্তু এ সাপ যখন কোন সাঁপুড়ের হাতে বা পাবলিক পলিসির নেটে আটকা পড়ে তখন তার কী পরিণতি হয়?
স্বাভাবিকভাবে বনে বসবাসরত প্রাণীদের মধ্যে শিয়াল একটা ধূর্ত প্রাণী। ধূর্ত হিসাবে তার সুনাম শুধু বনে নয়, মানব পরিবেশেও খ্যাতি আছে।
কিন্তু যখন ঘটনাক্রমে কৌশলের জালে আটকা বা ধরা খায় তখন ঐ চালাকির অবস্থা কেমন হয়?
ভেঙ্গুর প্রাণীটা তেমন কোন বড় বা চালাক বলে কোন বিশেষ পরিচিতি নাই যেমন,
ঠিক তেমনি এর সংঘবদ্ধ আক্রমণ ও কামড় অত্যন্ত বিষাক্ত। কিন্তু যখন কারো আক্রমণে ধরা খায় বা দূর্বল হয়ে মাটিতে পড়ে তখন পরিবেশ কেমন হয়?
ঠিক এমনিভাবে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যাকে বনের সবাই শুধু স্যালুটই না সার্বক্ষণিক অনেক নিরাপদ দূরত্বে রাখতে চায়। তার বিপদজনক ভয়ংকর আগ্রাসী আক্রমণ বনবাসী নয়, লোকালয়ের মানুষেরাও অত্যধিক ভয় পায়। কিন্তু যখন ঘটনাক্রমে সিস্টেমের কাছে আটকা বা বন্ধি হয় তখন চিত্রটা কেমন দেখায়?
বর্ণিত সকল প্রাণীই তাদের নিজ নিজ জায়গায় নিজ নিজ বলয়ে অত্যন্ত দাপুটে ক্ষমতাবান। তবে যখন যৌবনের বসন্ত ও কৌশলের ইতি টান শুরু হয়, তখন ক্ষমতা ও দাপট, কিংবা দাপট ও ক্ষমতার পোষাক নিমিষেই শেষ বা অস্তমিত হয়। পরে অসহায়ত্বের নোংরা লেবাস পড়া ছাড়া আর কোন বাতায়ন খোলা থাকেনা।
ঠিক তেমনিভাবে মানুষ জ্ঞান-গুণ,বিবেক-বিবেচনা, বিনয়-নম্রতা চিন্তা ও কর্মে পৃথিবীর সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের সনদধারী। আসলে কোরআন হাদীসেওতো তাই।
সময়ে মানুষেরা নিজের মধ্যে ভয়ানক অহংকার লালন করে, কিন্তু ঐ সময়ই আবার তাকে হলুূদ কার্ড নয়, একেবারে লালকার্ড দেখিয়ে চূড়ান্ত অপদস্ত করতে মোটেও দ্বিধা করেনা।
অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা-দাপট, রুপ-সৌন্দর্য ও বংশ মর্যাদা সহ জনবলের সকল সোনালী শক্তিকে পায়ে ঠেলে নিদারুন অসহায় হয়ে একেবারেই একা নিজ মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
কোথায় ব্যাংকভর্তি টাকা,হাওর ভরা জমি, বাজার ভরা ঘর, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, গোষ্ঠীভর্তি শক্তিশালী মানুষ, ও যশ-খ্যাতিতে নেটপূর্ণ পরিচিতি? কোনটাই সাথে নেই। এমন কি আশেপাশেও নেই।
সকলেই তার নিজ নিজ জায়গায় স্ব-মহিমায় চিরচেনা অভ্যাসে বিদ্যমান। এখন সে অন্যের অধিনস্হ হতে প্রস্তুতি গুনছে।
এমনকি মৃত্যু পরবর্তী ঠিকানা কবরে যাওয়ার সময় নিজের মালিকানায় চকচকে রঙিন বাইকগুলোও নীরবে কাঁদে। আমার মালিক আমার কাঁদে না বসে সচরাচর সকলের ব্যবহৃত মসজিদের পালকি নামের বাইকে চড়ে শুণ্য হাতে কবরে রওয়ানা হল।
সাথে গেল শুধু দর্জির ঘরে রক্ষিত কিছু সাদা কাপড়। যা দেহটাকে আবৃত করার মাধ্যম মাত্র।
তাই আসুন, ক্ষমতা,দাপট, ও অহংকারকে চূড়ান্ত ভাবে ঘৃণা করি। আর বিনয়-নম্রতা,বিবেক-বিবেচনা, ও নীতি নৈতিকতাকে নিজ জীবনে সঠিকভাবে জাগ্রত করে ইনসাফভিত্তিক সাম্যের সমাজ গঠন করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।