শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
প্রয়াত ধামাইল শিল্পী সৃষ্টি চৌধুরীর পুণ্যস্মরণে বৈষ্ণব সেবা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ও পদাবলী কীর্তন অনুষ্ঠিত শেরপুরে সংঘবদ্ধ হামলার স্বীকার সাইফ মারা গেছেন! বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে শেরপুরে আলোচনা ও পরিকল্পনা সভা হাওরকন্যা ইমার জয়যাত্রা: দেশের পতাকা বুকে নিয়ে একের পর এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে জেলার শ্রেষ্ঠ নকলার ইউএনওকে বিভিন্ন মহলের পক্ষে ফুলেল শুভেচ্ছা ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় গ্রাম আদালত বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত নকলা ইউএনও ও জালালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জেলার শ্রেষ্ঠ ধর্মপাশায় ইউনিয়ন পরিষদের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন রাষ্ট্র যখন সন্ধিক্ষণে: বাংলাদেশ, ইতিহাস, উগ্রতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন ভালুকা শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির অনুমোদন

অস্ট্রিক জাতি ও বঙ্গভূমিতে তাদের প্রভাব ◑ শেখ একেএম জাকারিয়া

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৬৫ বার পড়া হয়েছে
৫০২

◑ শেখ একেএম জাকারিয়া

অস্ট্রিকরা ঠিক কখন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আসতে শুরু করেছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই। তবে নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, নেগ্রিটোদের বহু পরে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে অস্ট্রিকভাষী একটি নতুন জাতিগোষ্ঠী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোচীন অঞ্চল (বর্তমান ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়া) থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এরপর তারা ভারতের আসাম হয়ে বাংলায়, অর্থাৎ প্রাচীন বঙ্গভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এদেরই অস্ট্রিক বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতিগোষ্ঠী বলা হয়।

তবে এই সময়টিতে বাংলার এই ভূখণ্ড ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সে সময় এ অঞ্চলের কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল কি না, তাও অস্পষ্ট। সম্ভবত তখন এই ভূভাগ ছিল নামহীন বা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেগুলো এখন আর নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

আশ্চর্যের বিষয়, এই সময়কালটি নূহ (আ.)-এর যুগের মহাপ্লাবনের সময়কাল, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ২৫০০ অব্দের কাছাকাছি। যদিও অস্ট্রিকদের আগমন এবং নূহ (আ.)-এর প্লাবনের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই, তবুও সময়ের এই মিল আমাদের ভাবনার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে। প্রাচীনকালে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন মহাপ্লাবন, অনেক সময় জনপদের ভৌগোলিক চেহারা ও মানুষের বসবাসের ধরণ পাল্টে দেয়। একদিকে যেমন কোনো পুরোনো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে তেমনি নতুন কোনো জাতিগোষ্ঠী নতুন এলাকায় এসে বসতি গড়ে তুলতে পারে। ঠিক সে ভাবেই, নূহ (আ.)-এর সময়কার মহাপ্লাবনের পরে অস্ট্রিকদের এই অঞ্চলে আগমন ও বিস্তার ঘটেছে বলেই অনুমান করা যায়।

অস্ট্রিকদের ভাষা ছিল ‘অস্ট্রিক’, যার আদি রূপ ছিল মুন্ডা বা মুন্ডারী। বাংলাদেশের বর্তমান ভীম, কোল, মুন্ডা, জুয়াং প্রভৃতি উপজাতিগোষ্ঠী এই ভাষাভাষী। বিশেষ করে মুন্ডা জনগোষ্ঠীর মুন্ডারী ভাষার সঙ্গে প্রাচীন অস্ট্রিক ভাষার ঘনিষ্ঠ মিল পাওয়া যায়। তাই ইতিহাসবিদদের ধারণা, তারা অস্ট্রিকদেরই উত্তরসূরি। ভারত ও বাংলাদেশে অস্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে প্রধান দুটি হলো মুন্ডা ও খাসি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুন্ডা ও খাসি ভাষা প্রচলিত, আর বাংলাদেশে বিশেষ করে দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে সাঁওতালদের মধ্যে সাঁওতালি ভাষা ব্যবহৃত হয়, যা অস্ট্রো-এশীয় ভাষা পরিবারের মুন্ডা উপপরিবারের অন্তর্গত এবং মুন্ডারী ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রায় সব ঐতিহাসিক অস্ট্রিকদের বঙ্গ অঞ্চলের প্রাচীনতম এবং দ্বিতীয় অধিবাসী জাতি বলে মনে করেন। অস্ট্রিকদের গায়ের রং ছিল গাঢ় কালো, মাথার গড়ন লম্বা, চুল ঘন, নাক প্রশস্ত, উচ্চতায় বেঁটে ও গড়নে মধ্যমাকার।
নৃতত্ত্ববিদদের মতে,অস্ট্রিকদের আদি বাসস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। এখান থেকে তারা পূর্ব ভারত, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যদিকে পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাংলায় তাদের আগমনের পথ ও সময় নিয়ে কিছু গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাদের মতে, মধ্য ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে তারা বাংলায় বসতি স্থাপন করে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোচীন অঞ্চল হয়ে ভারতের আসাম পেরিয়ে তারা বঙ্গভূমিতে প্রবেশ করে।

নৃতত্ত্ববিদদের মতে, এই অস্ট্রিক জাতিই বাংলার আদি জনগোষ্ঠী নেগ্রিটোদের স্থানচ্যুত করে বসবাস শুরু করে। হয়তো নেগ্রিটোরা আত্মরক্ষায় ব্যর্থ হয়ে উত্তর ভারতে বিলীন হয়ে যায়,বা দক্ষিণে সরে যায় অথবা অস্ট্রিকদের (প্রোটো-অস্ট্রালয়েড) সঙ্গে সংমিশ্রণের মাধ্যমে তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, নেগ্রিটোরা অস্ট্রিকদের আগমনের পূর্বেই কোনো অজানা কারণে অথবা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে নূহ (আ.)-এর যুগের মহাপ্লাবনে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

গবেষকদের মতে, অস্ট্রিক জাতি থেকেই বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে। তারা গ্রামাঞ্চলে বাস করত এবং এরাই প্রথম বাংলায় গ্রামব্যবস্থা গড়ে তোলে ও কৃষিকাজের সূচনা করে। এমনকি অনেক গবেষকের মতে, বাঙালিরা যে লাঙল ব্যবহার করে, সেটিও অস্ট্রিকদের থেকেই পাওয়া। অস্ট্রিকদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন: ভেড্ডিড, আদি অস্ট্রালয়েড, অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং নিষাদ। ‘নিষাদ’ নামকরণের কারণ হতে পারে, তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি শিকারেও পারদর্শী ছিল। আর ‘ভেড্ডিড’ নামটি সম্ভবত অস্ট্রিকদের কোনো আঞ্চলিক বা স্থানীয় রূপ।

তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা ছিল কৃষিনির্ভর। তারা কলা, লাউ, বেগুন, নারকেল, পানসুপারি, হলুদ, আদা প্রভৃতি ফসল চাষ করত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু না থাকলেও তারা হাতি পোষ মানাতে সক্ষম ছিল, এমন প্রমাণ মেলে। তারা সূতা দিয়ে কাপড় তৈরি করত এবং আখের রস থেকে চিনি উৎপাদন করত। তাদের সমাজে পঞ্চায়েত প্রথা প্রচলিত ছিল বলেও মনে করা হয়।অস্ট্রিক জাতির সাংস্কৃতিক প্রভাব বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতেও সুস্পষ্ট। যেমন: কার্পাস, তাম্বুল, মরিচ, লাঙল, ফল প্রভৃতি শব্দ অস্ট্রিক উৎসের। এ ছাড়া ডাঙা, ডিঙা, মুড়ি, খোকা, খুকি, ঝাউ, খড় এই শব্দগুলিও বাংলা শব্দভাণ্ডারে অস্ট্রিক প্রভাবের নিদর্শন।

সব মিলিয়ে, নৃতত্ত্ববিদগণ মনে করেন, প্রাচীন বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে অস্ট্রিকদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর ও স্থায়ী। বাঙালির জাতিগঠন, গ্রামসভ্যতা এবং কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির গোড়াপত্তনে এদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

লেখক: কবি ,গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

 

তথসূত্র:
১.বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড( রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
২. বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ(ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার
৩. ভারতের ইতিহাস কথা, ড. কিরণ চন্দ্র চৌধুরী
৪. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, (মাহবুবুল আলম)
৪. উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102