বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত জামালগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, অপরাধ দমনে জোর ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত

রহমতপুর মৌজার উদ্ভব ও প্রশাসনিক বিভাজন: এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫
  • ৪৯৪ বার পড়া হয়েছে
৪০৭

✪শেখ একেএম জাকারিয়া

সারাংশ

এই গবেষণায় রহমতপুর মৌজার উৎপত্তি, নামকরণ এবং প্রশাসনিক বিভাজনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৭৯০ সালের দশসনা বন্দোবস্ত দলিল ও ব্রিটিশ শাসনামলে জরিপ দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, রহমতপুর একটি বৃহৎ মৌজার বিভাজন থেকে উদ্ভূত হয় এবং রহমত আলী তাং নামক প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা এই নামকরণে মুখ্য ছিল। প্রবন্ধটি ইতিহাসের এক উপেক্ষিত অধ্যায়ের উপর আলোকপাত করে, যেখানে স্থানীয় মিরাসদারদের ভূমিকা মৌজার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ভূমিকা

বাংলাদেশের গ্রামীণ ভূ-প্রশাসনিক কাঠামোয় ‘মৌজা’ হলো রাজস্ব আদায়ের প্রাথমিক একক। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামলে এই ইউনিট রাজস্ব প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় (Ahmed, 2004)। বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসনামলে দশসনা বন্দোবস্তের মাধ্যমে মৌজা গঠনের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রাধান্য এবং অংশগ্রহণ গভীর প্রভাব ফেলেছে। রহমতপুর মৌজার ইতিহাস তার ব্যতিক্রম নয়।

১৭৯০ সালের এক দশসনা বন্দোবস্ত দলিল বিশ্লেষণে দেখা যায়, রহমতপুরের উৎপত্তি এক বৃহৎ মৌজার বিভাজনের মধ্য দিয়ে হয়েছিল, যেখানে রহমত আলী তাং নামের একজন ব্যক্তির ভূমিকা ছিল মুখ্য। এছাড়া, হাসন-গবেষক সামারিন দেওয়ানের ‘সাবেক চৌধুরীগণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (বই নং ১)-এ ১১ নম্বর তালুক বন্দোবস্তগ্রহীতা হিসেবে রহমত আলীর নাম পাওয়া যায়।

১. দলিলভিত্তিক প্রাথমিক তথ্য

পরগণা : লক্ষ্মণশ্রী

তৌজি লিখিত ন-মহাল : ২৪৬০৯

বন্দোবস্তের ধরন : দশসনা (১০ বছরের রাজস্ব বন্দোবস্ত)

বন্দোবস্তগ্রহীতা : রহমত আলী তাং

দশসনা বন্দোবস্ত গ্রহণের সময়কাল : ১৭৯০ সাল ¹

২. দলিলের পাঠ্যাংশ ও মৌজাসমূহ

দশসনা বন্দোবস্ত দলিলে উল্লেখ আছে:

“দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও মৌ প্রং মৌজে-ঢাকুয়ার হাওর, রহমত নগর ওরফে রহমত পুর, মোহন পুর, সরদার পুর, জয় নগর, আমদ পুর ও সাখাইতি।” ²

এই বাক্যাংশ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, “দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও” একটি বৃহৎ মৌজা ছিল, যার পরিসরে উপরের সাতটি স্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

৩. “মৌ প্রং” শব্দবন্ধের ব্যুৎপত্তি

“মৌ প্রং” শব্দবন্ধের ব্যবহার একটি মৌজার অন্তর্গত এলাকার ইঙ্গিত করে, যা ইংরেজিতে “within the precincts of the mouza” হিসেবে অনূদিত হতে পারে (Hunter, 1881)। এটি প্রমাণ করে, দলিলে উল্লিখিত সব স্থান পূর্বে একটি বৃহৎ মৌজার অংশ ছিল।³

৪. প্রশাসনিক ও জরিপ-ভিত্তিক বিভাজন

বিভক্ত মৌজাসমূহ:
১. ঢাকুয়ার হাওর
২. রহমত নগর ওরফে রহমতপুর
৩. মোহনপুর
৪. সরদারপুর
৫. জয়নগর
৬. আমদপুর
৭. সাখাইতি

এই বিভাজন সম্ভবত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব জরিপের সময় (১৮০০–১৮৬০) বাস্তবায়িত হয় (Bengal Settlement Report, 1859)। জরিপ অনুযায়ী, এই এলাকার আলাদা মৌজায় পরিণত হওয়ার পেছনে রাজস্ব কাঠামোর সহজীকরণ ছিল মূল লক্ষ্য।⁴

৫. রহমতপুর মৌজার নামকরণ ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১৮৬২ সালের দলিলে “রহমত নগর ওরফে রহমতপুর” হিসেবে নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, প্রথমে এলাকার নাম ছিল “রহমত নগর”, যা পরে স্থানীয় প্রয়োজনে “রহমতপুর” রূপে রূপান্তরিত হয়।

রহমতপুর নামটি রহমত আলী নামক একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির স্মৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। তিনি ছিলেন উক্ত মহালের বন্দোবস্তগ্রহীতা এবং তাঁর নামের শেষে ‘তাং’ উপাধি যুক্ত ছিল। এই উপাধিটি ব্যতিক্রমী, কারণ পরগণার অন্যান্য বন্দোবস্তগ্রহীতাদের নাম যেমন মোহাম্মদ আমির, লক্ষ্মণ রাম বা রামদাস, মেঘু পুরকায়স্থ, তাঁদের নামের শেষে কোনো উপাধি ছিল না (Collectorate Register, 1862)।

‘তাং’ উপাধির অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায়, রহমত আলী সম্ভবত বন্দোবস্তের আগেই তালুকদার বা স্থানীয় ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর সামাজিক ও প্রশাসনিক মর্যাদাই সম্ভবত “রহমত নগর” নামের পেছনে ছিল। এই নাম থেকেই ‘রহমতপুর’ মৌজার নাম উদ্ভূত হয়। এটি কেবল একটি মৌজা বা গ্রামের নাম নয়, বরং একধরনের লোক-ঐতিহাসিক স্মারক।

৬. ঐতিহাসিক গুরুত্ব

রহমতপুর মৌজার ইতিহাস প্রমাণ করে, ভূমি প্রশাসনের দলিলপত্র কেবল কর আদায়ের তথ্য নয়; বরং তৎকালীন সমাজে ব্যক্তিগত প্রভাব, নামকরণ প্রক্রিয়া ও জনপদের বিবর্তনকেও ধারণ করে।

২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর পুরাতন বন্দোবস্ত দলিলের ভিত্তিতে সিলেট ভূমি অফিসে অনুসন্ধান চালানো হলে নতুন দলিলে নিম্নরূপ তথ্য পাওয়া যায়:

থাক নম্বর : ২৮২৪

পরগণা : লক্ষ্মণশ্রী

মৌজা : দাড়ারগাঁও মৌজা (দ্বিতীয় খণ্ড)

তৌজি নম্বর : ২৪৬০

মহাল নম্বর : ২৪৬০৯

নাম : রহমত আলী, দশসনা, রহমতপুর

এ দলিলের অপর পৃষ্ঠায় “১৮৬২ ইং সাল” উল্লেখ থাকায় রেকর্ড রুম শাখার অফিস সহকারী থৈইঅংগ্য মার্মা জানান, দলিলটি ১৮৬২ সালে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর ধারাবিবরণী ১৭৯০ অর্থাৎ দশসনা বন্দোবস্ত থেকে শুরু হয়ে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত রেকর্ডে লিপিবদ্ধ আছে।

উপসংহার

রহমতপুরের ইতিহাস প্রমাণ করে, ইতিহাস কেবল যুদ্ধ, শাসক বা সাম্রাজ্যের কাহিনি নয়; এটি সাধারণ মানুষের উদ্যোগ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে। তৎকালীন শ্রীহট্টের ২৭ পরগণার মধ্যে বাইশ বা একুশ পরগণার চৌধুরীগণ এবং ছয় পরগণার জমিদারগণ একটি আমোক্তারনামায় দস্তখত করেছিলেন। সেই বাইশ পরগণার চৌধুরীর মধ্যে কোনো এক পরগণার চৌধুরীর উত্তরপুরুষ ছিলেন রহমত আলী তাং। অর্থাৎ, তাঁর পূর্বপুরুষরাও দীর্ঘকাল ধরে চৌধুরী উপাধি বহন করতেন।

হাসন-গবেষক সামারিন দেওয়ানের সাবেক চৌধুরীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বই-এও রহমত আলীর নাম উল্লেখ আছে। দশসনা বন্দোবস্তের দলিলে তাঁর নামের সঙ্গে শেষবারের মতো তালুকদার উপাধি ব্যবহৃত হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির, অর্থাৎ রহমত আলী তাং-এর উদ্যোগে মৌজার নামকরণ ও বিভাজন সংঘটিত হয়, এবং তার প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রভাব আজও রহমতপুর মৌজার অস্তিত্বে লিপিবদ্ধ।

ফলস্বরূপ, বৃহৎ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যদিও রহমতপুরের ঘটনা ক্ষুদ্র, তবু এটি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল এবং একধরনের ‘লোক-ঐতিহাসিক স্মারক’ হিসেবে মূল্যায়নযোগ্য। এটি প্রমাণ করে, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমও একটি জনপদের ইতিহাসের আকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক । 

পাদটীকা

¹ ১৭৯০ সালের দশসনা বন্দোবস্ত দলিল, পরগণা: লক্ষ্মণশ্রী, মৌজা: দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও, তৌজি লিখিত ন-মহাল: ২৪৬০৯, বন্দোবস্তগ্রহীতা: রহমত আলী তাং, দশসনা বন্দোবস্ত।
² (১৮৬২ সালে প্রণীত) একই দলিল, “দ্বিতীয় খণ্ড দারার গাঁও মৌ প্রং মৌজে…”।
³ Hunter, W. W. (1881), A Statistical Account of Assam (Vol. II). London: Trübner & Co.
⁴ Bengal Settlement Report (1859), Reports of Land Revenue Settlements in Bengal (1856–65). Calcutta: Government Printing Press.

তথ্যসূত্র

Ahmed, S. U. (2004). Rural Administration and Land Revenue in Bengal. Dhaka: University Press Limited.

Bengal Settlement Report (1859). Reports of Land Revenue Settlements in Bengal (1856–65). Calcutta: Government Printing Press.

Collectorate Register (1862). Sylhet Collectorate Record Room, Land Settlement Documents.

Dewan, S. Sabek Chowdhurider Songkhipto Itihash (সাবেক চৌধুরীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (বই নং -১). Sylhet: Hasan Research Centre.

Hunter, W. W. (1881). A Statistical Account of Assam (Vol. II). London: Trübner & Co.

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102