বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত জামালগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, অপরাধ দমনে জোর ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত

অল্পে তুষ্ট

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫১ বার পড়া হয়েছে
৪৭৯

আশ্রাফুল আলম মোঃ নুরুল হুদা
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
বড়দল উচ্চ বিদ্যালয়, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।

 

সূর্যের আগমনে দিনের কোলাহল শুরু। দিন তার আপন গতিতে সামনেই চলছে। কেউ তাকে ব্যারিকেড বা আটকানোর সাহস আগেও পায়নি,এখনো পায়না আগামীতেও পাবেনা। এটা স্রষ্টা প্রদত্ত চিরসত্য, চিরস্থায়ী আপোষহীন এক রুটিন। সকল রুটিনেই নানামুখী কৌশল,পরিবেশ, চাপ,সুবিধা ও অসুবিধার প্রশ্ন বিদ্যমান। প্রয়োজনে একবার নয়, হাজারবার ভেঙে সংশোধন করার সময় ও সুযোগ থাকে। কিন্তু এ রুটিন ভাঙ্গার ক্ষমতা আকাশ ও জমিনে স্রষ্টা ব্যতীত কারো নেই।
এ রুটিনেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়, ইতিহাস ভাঙ্গে। কেউ জগতে মহাপুরুষের সিংহাসন পেয়ে নিজেকে ধন্য করেছে। আবার কেউ ডাষ্টবিনের কীটকেও হার মানিয়েছে। এটা যার যার কাজ,আচরণ, বক্তব্য ও সৃজনশীলতার পরিচয়ে ইতিহাস তৈরিতে সায় দেয়।
আচরণের ভীরে আজ একজন স্বাধীনচেতা সহজ,সরল আলোকিত মানুষের জীবনাচরণে আটকা পড়েছি।
নাম ইদ্রিস মিয়া, পিতা মৃত মন্তাজ মিয়া। গ্রাম ইউনুছপুর।
উনি একেবারে সাদামাটা জীবনের একজন মানুষ। ৭০ কাছাকাছি বয়স, বডি ফিটনেস মোটেও সবল বা শক্তিশালী নয়, কোনভাবে একরকম চলাফেরা করতে পারেন। গ্রামের পরিবেশেই বেড়ে ওঠা। একজন মানুষের স্বাভাবিক অতীত যেমন উনার ক্ষেত্রেও তেমন। মা-বাবা ভাই -বোন, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সাংসারিক ব্যস্ততা। তিন ছেলে,তিন মেয়ে। ছেলে দুই জন বিবাহিত। একজন অবিবাহিত। বিবাহিত ছেলেরা রঙ্গিন সুখের আশায় অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্ত্রী নামক মায়াদার বউ নিয়ে নিজে আলাদা সংসার শুরু করেছে। মেয়েরাও সবাই নিজ স্বামী নিয়ে নিজ নিজ সংসারে সূখ শান্তি আর উন্নতির চিন্তায় বিভূর। এ দিকে অপরিণত একটা ছেলে ও নিজ বয়স্ক বউ নিয়ে নিজের চেনা সংসারে ইদ্রিস মিয়াও ধীর গতিতে শেষ পথে এগিয়ে চলছেন। কেউ থেমে নেই। ব্যবধান শুধু বয়স, সম্পর্ক ও কাজের। মনের দিক থেকে সকলেই কঠোর পরিশ্রমী। শ্রম বিক্রিই তাদের উপার্জনের হাতিয়ার।
ছেলেরা যেমন পিছে না থাকিয়ে সামনের দিকে নিজ ও নিজ পরিবারের রুটি রুজির সন্ধানে আছে,তদ্রুপ মেয়েরাও একি সন্ধানে। ফেলে যাওয়া বৃদ্ধ বাবা তাদের বৃদ্ধ মা ও পাখা না গজানো অপরিণত ছেলেকে নিয়ে মাঠের রুজিতে নীরব যোদ্ধা ইদ্রিস মিয়া।
বয়সের শেষ বিকেলে ৩ সদস্যের পরিবার নিয়ে অজানা নৌকার হাল ধরেছেন। কাক ডাকা ভোরের আগমনে মুরুব্বি ইদ্রিস মিয়ার ঘুম ভাঙে। যখন এ বয়সের মানুষেরা কেউ জায়নামাজে,কেউ বিছানায়, কেউ বা বাসায় কারো সেবা নেওয়ায় বা নেওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু এমন হিসেব ও সূচী ইদ্রিস মিয়ার জীবন তালিকায় পরিচয় নেই। তাঁর আছে শুধু বিরামহীন, প্রতিবাদহীন, স্বপ্নহীন কঠোর খাঁটুনি। যা তাঁকে কোন সময়ই ভালো পোশাক,ভালো খাবার, ভালো পরিবেশ,ভালো সম্পর্ক করার কোন সুযোগের ক্ষেত্র দেয়নি। সকাল থেকে শুরু হয় চিরচেনা কাজের তাড়না। ঘরে ভালো মন্দ যা আছে খুশি মনে হাসিমুখে হজম করে নিজ কাজে বেড়িয়ে পড়লো। নেই কোন অভিমান, নেই কোন অভিযোগ, নেই কোন আলস্য, নেই কোন হিংসা বা পরচর্চা।
হাটে ডুকে কিছু শশা,কিছু লেবু,কিছু মুড়ি, কিছু ছানা, কিছু চানাচুর ও কিছু ভুট তথা আনুমানিক ৫০০ টাকার মত পণ্য মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে আসলেন। পরে উনার বৃদ্ধ সহযাত্রী বুড়ী বউ নিজ হাতে মশলা বনিয়ে উনার স্টেন্ড সহ পুরু পণ্যের সামগ্রী মাথায় দিয়ে অপলকনেত্রে রাস্হার দিকে চেয়ে থাকলো। পাড়া থেকে পাড়ায়, বাড়ি থেকে বাড়ি এমনিভাবে মাঝে মধ্যে স্কুলেও চলে আসেন। স্কুলে আসলে এক কোনায় নিজের বাসন সহ পণ্যগুলো নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্কুলের বাচ্চারা উনার থেকে কেনাকাটা করে।
কি জানি হঠাৎ আমার কিউরিওসিটি জাগলো উনার সাথে কথা বলি। জিজ্ঞেস করলাম নাম ঠিকানা,। উনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। কিন্তু আমি যাওয়ামাত্রই উনার ছোট খাটো হাফ মেরামত করা টুলটা নিজের বসা থেকে উঠে আমাকে দিলেন। আমি বসতে রাজি নই,তারপরেও উনি নাছোড়বান্দা। আমাকে বসতেই হবে। চেষ্টা করে কৌশলে এড়িয়ে গেলাম বসলামনা। উনাকেই বসালাম। এর ফাঁকে উনি আমাকে ঝাঁলমুড়ি বানিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসলেন। খেতে হবে জিজ্ঞেস করলাম, না খেলে হয়না। না খেয়ে নিন, সমস্যা নাই। খাওয়ার পর বিলটা উনার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে দিতে হলো। জিজ্ঞেস করলাম আপনি দৈনিক কত টাকা সেইল করতে পারেন? ভাঙ্গা ও অস্পষ্ট গলায় খুব আস্হে আস্হে উচ্চারণ করেন হয় বেচতে পারি ৪ থেকে সাড়ে ৪শ টাকা। এ গুলো বিক্রি করতে সময় কেমন দিতে হয়? সহজ সরল কাঁপা কন্ঠে আওয়াজ করলেন আমনাদের স্কুলেততে গিয়া গেরাম করমো। বাদে হান্জালা বায়িজজামো।
এতে আপনার লাভ কত হবে? বৃদ্ধ মুরুব্বির সাদা মাটা উত্তর (১৫০ থেকে ২০০) দেড় দুইশ টেহা থাহে। খরচফাতি ছলে। আল্লা ছালা ছার।
আল্লাহুআকবার, আল্লাহুআকবর। আমরা যারা লক্ষ, লক্ষ টাকা ইনকাম করি তার অধিকাংশের মাঝেইতো এমন সুন্দর, সহজ ও স্বাভাবিক উত্তর দেওয়ার সাহস নেই। অথচ লোকটির সামান্য টুকরিতে বড়জোর ৪ থেকে ৫০০ টাকার পুঁজি আছে। এ থেকে আমাকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে নিজ হাতে তৈরী করে ঝালমুড়ি এগিয়ে দিল। নিজের বসার ভাঙা টোলটা বসতে দিল, প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিল। নিজের দৈনিক লাভের পরিমাণ উল্লেখ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়েও নেই তাঁরকোন কৃপণতা।
নিজ আধা ভাঙা ঘরে না আছে সঠিক বেড়া, না আছে সঠিক ছাউনি, না আছে সঠিক বিছানা, না আছে সঠিক খাট। না বলতে যা বুঝায় তা সকলটিই বিদ্যমান। তারপরেও দিনশেষে সফলতার আনন্দ নিয়ে নিজ ঘরে ডুকে বৃদ্ধ বুড়ী বউয়ের পাক করা খাবার হজম করে নিশ্চিন্তে শুয়ে পরেন। এক ঘুমে একেবারে খখরাণী দিয়ে নিরাপদে রাত শেষ হয়ে ভোরের আগমন ঘটে। আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!!
কিন্তু আজ সত্যিই মনের মধ্যে বেশী বেশী প্রশ্ন জাগছে?
লক্ষ,লক্ষ বা কোটি কোটি টাকা থাকার পরেও জীবন ভোগের একটি রুটিনেও সফলতা নেই। নেই ঘুম,নেই বিশ্রাম,নেই পরিবারে সময়দান,নেই সঠিক নিরাপত্তা ও নেই ধর্মীয় সত্যিকারের চর্চা। কারণ কী? জবাব একটাই আমরা টাকার পিছনে অন্ধ হয়ে দৌড়তেছি। যা আছে তাতে তুষ্ট নই। কিন্তু ওই খেটে খাওয়া ঝাঁলমু্রি বিক্রেতা মুরুব্বির সকল কিছুই আছে।
তার কারণ একটাই উনি অল্পে তুষ্ট। উনার টাকার পিছে হয়রানী বা খাই খাই চিন্তা নেই। যা হচ্ছে বা পাইছেন তাতেই আলহামদুলিল্লাহ।
আমাদের সমাজে ডানে বামে সামনে পিছনে নীরব নিভৃতে শত সহস্র মুরুব্বি ইদ্রিস মিয়ার কর্ম,চিন্তা, মনোবল ও সততা বিদ্যমান। যাদের আমরা বেখিয়ালে এড়িয়ে যাই।আজ সকল মুরুব্বি ইদ্রিস মিয়াকে মনের গভীর থেকে জানাই হাজারো কৃতজ্ঞতা ও স্যালুট।
তাই আসুন,
মিথ্যে দুনিয়ায় নিজের মান,সম্মান বজায় রাখতে যা প্রয়োজন, তা বাদে বাঁকা রাস্হায় মাত্রাতিরিক্ত টাকার পিছনে না দৌড়ে, হয়রানী না হয়ে অল্পে তুষ্ট হই। এবং আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করি তাহলেই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াব হবো ইনশাআল্লাহ।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102