বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত জামালগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, অপরাধ দমনে জোর ঝিকরগাছায় শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ৬ নভেম্বর। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শান্তিগঞ্জে মানববন্ধন উন্নত ও বৈষম্যহীন ভাটিপাড়া ইউনিয়ন গড়তে কাজ করে যাব—নিয়াজ মাহমুদ রিপন শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা শান্তিগঞ্জে প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শান্তিগঞ্জে মহামায়া যুব সংঘের উদ্যোগে গুরুজন সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন সুনামগঞ্জে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে ধরতে FIVDB-RAISE প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ সভা অনুষ্ঠিত

ফকির সমছুলকে স্মরণ 

সুনাম দিগন্ত ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশ রবিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৫
  • ২৩২ বার পড়া হয়েছে
২৫১

এনামুল কবির

বাঙালির স্বভাব মর্মমুখী। এটা তাঁকে শুধু ভাবুক করেনি, উদাসীন ও একই ভাবে করেছে গানের মানুষ। বলতে গেলে এখন এটা একান্তই তাঁর নিজস্ব ও তুলনারহিত পরিচয়ের একটা দিক। এখানে আমরা খুঁজে পাবো সে চিরদিনের ভাবুক ও গানের বাঙালিকে। আমরা জানি সমছুল ছিলেন সেই ধারার মানুষ, কেবল ভাবের নয়, গানেরও। তাই এখানে দেখবো উদাস করা সে ভাব ও গানে সমছুল কীভাবে বাউল হয়েছিলেন, ছুফি মতে হয়েছিলেন ফকির; নামডাকে বাউল- ফকির সমছুল। সম্ভবত এখানে তিনি ছিলেন সে ভাব ও ধারার একটা ধ্রুবচিহ্নের শেষ প্রতিনিধি। এটা এমন নয় যে, উত্তরকালে সে বাউলিয়ানা আর থাকছে না, স্রোতহীন হয়ে যাবে বাঙালি; তাঁর তাবৎ ভাববিশ্ব ও গান। এখানে আমরা একটা পরিবর্তনশীল সময় ও দ্বন্দ্বের কথা ভুলে যাচ্ছি না। এদিক থেকে মনে করি ফকির সমছুলকে তাঁর সময় ও বাস্তব অবস্থার দিক থেকে পাঠ ও বিচার করা প্রয়োজন এবং অবশ্যই সেটা হবে বাঞ্ছনীয়। যদিও এখানে এর কতটা আমরা করতে পারবো সেটা একটা প্রশ্ন। তবুও এখানে এই চেষ্টার অংশরূপে বলতে হবে, এখন সশরীরে না থাকা সমছুল আমাদের কাছে কেবল সে বিচার ও প্রযত্নই পেতে পারেন। এর জন্য অবশ্য কখনওসখনও আমাদের গিয়ে তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতির সামনে দাঁড়াতে হবে। সন্দেহ নেই এখানে ফকির সমছুল ছিলেন পুরো আন্তরিক- ভাবুক ও শিল্পী মানুষ।

এখানে ফকির সমছুল কেবল গান গাইতেন না, একটা সময় করিম শাহসহ এমন মহাজনদের সাথে তাঁকে বেশ মালজোড়া গাইতে শুনেছি, পরবর্তীতে এই মানুষটি তাঁর মন দিয়েছেন লোকসাধনা- মরমি সঙ্গীতে এবং রত্নকরীয় এক ধৈর্যে সৃষ্টি করে গেছেন ‘আশিকের রত্ন’। যে মর্মবাদিতা তাঁকে ভাবের মানুষ করেছিল, এখানে আমরা দেখবো এর মর্মবেদনা তাঁকে করে তুলেছিল বাংলার বাউল- বাংলার লোককবি। এখানে তিনি হয়তো তত শিক্ষিত ছিলেন না, আমরা যে অশিক্ষিত সাধারণের কথা জানি, তাদের অধিকাংশ তো গ্রামের মানুষ, তাঁর সাধনা ও সঙ্গীতে তিনি হলেন তাদের। স্বভাবত এখানে তাঁর গানে থাকতো সেই সাধারণ মানুষের কথা, লোকায়তের শিক্ষা তো বটেই এবং শেষপর্যন্ত একটা একই সমতলের ব্যাপার বা লোকজীবন। বলতে গেলে এখানে বাউলের ধ্যান ও সার্থকতা। তাহলে এখানে শ্রেণি প্রশ্নটা থাকছেই, সমছুল ছিলেন এখানে গ্রামের সে মানুষ- সাধারণের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি। আমরা দেখি বাঙালির নিজস্ব সে গান- বাউল গানে তিনি কতটা নিমজ্জিত ছিলেন। এখানে আমরা তাঁর গণসঙ্গীত রচনার তথ্য আর কতটা পাই! যদিও বাংলার বাউলের মতো তিনি সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের সবক্ষেত্রে প্রশ্নহীন ছিলেন না, তবু সে তত্ত্বমতে বলতে হবে এমন অনেক অচলায়তনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর দ্রোহ; একই সাথে তাঁর জীবনের ভাবনা ও সাধনমার্গ। এখানে শাস্ত্রের হয়েও তিনি ছিলেন ভাবুক বাঙালি, তাঁর সম্প্রদায়- বাউলের এবং সে মতপথের লোকমান্য মহাজন তো বটেই।

এখানে সমছুল কতটা সমন্বয়বাদী ছিলেন আমরা বলছি না, যতটা সম্ভব দেখছি তিনি ছিলেন কতটা সামাজিক। তাঁর শ্রেণি সম্পর্কে সচেতনতা ও শিল্পীমন আমাদের সেটা ব্যাখ্যা করে। বলা বাহুল্য এখানে তাঁর একটা লড়াই-সংগ্রাম ছিল, ফলে বাংলার বাউল-ফকিরের মতো তিনি হবেন সম্প্রদায় নির্বিশেষ- অসাম্প্রদায়িক কবি তা স্বীকার করতে হয়। আমরা যারা তাঁকে চিনতাম, তাদের কাছে আপাত সে প্রশ্ন নেই জানি। এখনকার বেদনাদায়ক খবরটা হলো বাঙালি ভদ্রবিত্ত আর এসব লোককবিদের খুব একটা খোঁজখবর নেয়? সে সংখ্যাটা লক্ষণীয়রূপে মানতে হবে এখন সীমিত, তাই শান্তিগঞ্জের ফকির সমছুলের প্রতি সেভাবে কারও নজর পড়ে না। এমন অনেকে তাই থেকে যান আড়ালে, কখনও যোগ্য কারও আলোকসম্পাতে জানা যায় মরমি- লোকসাহিত্যে তাঁদের অবদান এবং সে ভাবসম্পদকে। মনে পড়ে আমাদের লোকসাহিত্যে সমছুলের কী পরিচয় ও অবস্থান সেটা কবিবন্ধু দীন ভালোই দেখিয়েছেন। তাই এখন এই সাহিত্য থেকে লোকপ্রজ্ঞার একটা উপস্থিতি যদি আমরা খেয়াল করি, তবে দেখবো সে প্রজ্ঞার একটা বনেদি ঐকান্তিক অধিকার ছিল সমছুলের; তাঁর মধ্যে ছিল সে ভাব ও ভাষা। এখন তাঁকে এই স্মরণের দায়টাও বলতে হবে আমাদের সে-ই লোকপ্রজ্ঞার অঙ্গীভূত- বিষয়ীর এক স্মৃতিভাষ্য।

এটা বলতে হবে যে, ফকির সমছুল আমাদের দূরবর্তী কেউ ছিলেন না। যেহেতু একই উপজেলায় বাড়ি, পার্শ্ববর্তী গ্রাম- আক্তাপড়ার মানুষ ছিলেন, তাই তিনি আমাদের এলাকার লোক থেকে কতটা ও কীভাবে নিজেদের হয়ে উঠেছিলেন এখানে এই লেখাটাকে বলতে পারেন কেউ আত্ম-আশ্রিতধর্মী বয়ান। ফকির সমছুল যে গ্রামের মানুষ, এখন সেটা কেবল একটা গ্রাম নয়, আক্তাপাড়া বাজারও হলো এখানকার আত্মপরিচয়। উল্লেখ্য যে, আমরা এর প্রসিদ্ধির কথা যতটা জানি, সেটা এই কদিনের বা আজকের নয়। বিশেষ করে বাস্তুসংস্থানের কথা ভাবলে এই বাজারে কয়েক উপজেলার লোকদের আসতে হতো। একটা সময়ের কথা বিবেচনা করলে বাঁশ ও শনের চাহিদা ছিল এখানকার অধিক। এখনও এর চাহিদা নেই তা নয়, তাই এর ভরসাস্থল বলতে যা বুঝতে পারি, আক্তাপড়া বাজার হলো কি না সেই জায়গা। বলতে গেলে শান্তিগঞ্জের ফকির সমছুল এর বাড়ি আক্তাপাড়া হলেও তিনি ছিলেন এই আক্তাপাড়া বাজারেরও মানুষ। এখন এই বাজারের পশ্চিমে যে বড়সড় একটা মার্কেট দেখি, এর লাগোয়া উত্তরের টিনসেটের বাড়িটা ছিল তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি তথা বসতভিটা।

আমরা যতটা জানি, এখানে ১৩৪৮ বাংলার দিকে সমছুল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা- লাল মামদের তিনি ছিলেন প্রথম পক্ষের ও বড় সন্তান; বৈমাত্রেয় ভাই তিনজন হলেন নূরুল হক, আইনুল হক ও সবার ছোট সাদ মিয়া। এখন তো সমছুল নেই, তাঁর অপর দুই ভাইও মারা গিয়েছেন। সবার ছোট যে ভাই সাদ- এখন কেবল বেঁচে আছেন, তাঁর ধরাধরপুরের বাড়িতেই থাকেন; সাধ্য মতো দেখাশোনা করেন সমছুল ভাইয়ের মাজারের। এটা ঠিক যে, পৈত্রিক ভিটা থেকে সমছুল একসময় বের হয়ে গিয়েছিলেন। এখন বাজারের পূর্বে- মহাসিং তো তার পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে, সে নদীর পূর্বপাড়ে ধরাধরপুরের এই বাড়িতে গিয়ে বসবাস করছিলেন। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত এখানে কাটিয়ে গেছেন তাঁর শিল্পী ও সাধকের জীবন। অবশ্য দুপাড়ের জীবন ও এই শিল্প-সাধনায় তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন সুফিবাদে, এছাড়া বাংলার বাউল হিসেবে তাঁর মনে বৈষ্ণব উত্তরাধিকার ছিল না তাও নয়। বাংলার এই বাউলের পাটাতন কোথায় এখানে সেটা আমরা ভালোই লক্ষ করি। মনে পড়ে আমাদের সান্নিধ্য ও আড্ডার দিনগুলোতে তিনি তাঁর মুর্শিদ নয়ান ভানুর কথা বলতেন, এর সবটা এখন মনে নেই। তবে নির্দ্বিধ বলা যায়, সমছুল তাঁর এই গুরুকৃত্যে পরম আশ্রিতের জীবন কাটিয়ে গেছেন। এছাড়া দুপাড়ের এই ভাব ও সাধনায় গুরুর কৃপা লাভে দীর্ঘদিন আয়োজন করে গেছেন উরশ- যা ছিল লোকউৎসব এবং সেটা হতো তাঁর মুর্শিদ নয়ান ভানুর মৃত্যুদিনে। তাঁর ধরাধরপুরের বাড়িতে সেরকম আয়োজনের কয়েকটিতে যাওয়ার স্মৃতি আছে এই অধম লেখকের। বেশ দেখেছি দূরদূরান্ত থেকে এখানে বাউলেরা এসেছেন এবং রাতভর গান গেয়েছেন। কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে এসেছেন মোস্তাক আহমাদ দীন, শেখ লুৎফর, আহমেদ জুনায়েদ, আলফ্রেড আমেন ও আবু তাহের তারকেরা।

একদিন এই দেশে কত মেলাই না হতো, এখন সে মেলা ও উৎসব কি না ভগ্নদশার শিকার! যাক, এই আয়োজনকে ঘিরে তখন ধরাধরপুরে আমরা বেশ বড়সড় মেলা বসতে দেখেছি, সে রাত ও এর পসরা ছিল আমাদের মনে রাখার মতো বিস্তৃত। এখনও মনে পড়ে এইসব রাতগুলোতে একজন আজিজুন্নেসা ছিলেন কীরকম প্রবল- দরদপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। এই মানুষটি ছিলেন সমছুল ভাইয়ের স্ত্রী, অন্যদের মতো তিনিও কি না তাঁকে পীরানি বলে ডাকতেন। আমরা তো তা-ই ডাকতাম এবং এই মহীয়সী নারীকে তাঁর ব্যক্তিত্ব দেখে বিস্মিত হতাম। সুজিতদের মতো অনেককে দেখেছি তাঁকে মাইজি বলে ডাকতে। সমছুল ভাই ও পীরানি নিঃসন্তান ছিলেন, তাঁদের এই যৌথযাপন ছিল এরকম- তাঁদের সেদিকটাকে ভালোই আড়াল করে দিয়েছিল। বেশ বড়সড় একটা শিষ্যবর্গ ছিল ফকির সমছুলের। সেবায় অন্তপ্রাণ এই নারীর কাছে এখানকার সবাই ছিল তাঁর কতই না আপন! তাই সুযোগ মতো এই মানুষটিকে নিয়ে সমছুল ভাইকে বেশ গর্ব করতে দেখেছি, জীবনে কোনও দুঃখবোধ তাঁকে গ্রাস না করার কৃতিত্ব দিয়ে গেছেন এই পীরানিকে। অবশ্য ব্যক্তি জীবনে ফকির সমছুল নারীদের প্রভূত শ্রদ্ধাই করতেন। আসলে তিনি তিনি ছিলেন একজন মাতৃভক্ত মানুষ। দুএকবার কাছ থেকে দেখেছি তাঁর সে শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ। সর্বশেষ তাঁর ও আমাদের সে পীরানিকে দেখি ২০১৮’র ৭ মার্চ; সেদিন ফকির সমছুল ভাইয়ের ৭৬ বছরের জীবন অবসান হয়, শান্তিগঞ্জের মহত্তম ও সৃষ্টিশীল এই বাউল মানুষটি মারা যান। তারপর আর সমছুল ভাইয়ের ধরাধরপুর যাওয়া হয়নি। যদিও শুনেছি যে, এখন আর নয়ান ভানুর নয়, তাঁর- ফকির সমছুল ভাইয়ের সম্মানে উরশ হয়, বাড়ির উঠোনে সুজিতরা যে মাজার নির্মাণ করে নিয়েছেন, সেখানে তাঁর মৃত্যুদিনে বসে গানের আসর। এখন তাঁর মাজার ঘেঁসে আরও একটি কবর দেখা যায়, সেটাও পাকা করা এবং উপরে দেওয়া হয়েছে কাপড়- এটা পীরানির খবর! জেনেছি সমছুল ভাইয়ের অর্ধযুগ পর- ২০২৪’র ১০ মে যে এই মহীয়সী মারা গিয়েছেন! তাঁকে আর না দেখতে যাওয়ার অপরাধে এখন ভুগি, আমাদের ব্যস্ততা আর আলস্য আমাদের সকল স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের জন্য হুমকিই বলতে হবে।

এখানে মনে পড়ে আক্তাপাড়া তো আমার কম যাওয়া হয়নি, এই গ্রাম ও বাজার এখন ধারন করে আছে একটা বড় সংযোগ সড়ক- ‘ঢাকইয়া রাস্তা’। কিন্তু একটা সময় আমাদের কাছে সেটা পায়ে হাঁটা পথ বা সড়ক ছাড়া কিছু ছিল না। হেমন্তে এই ছিল সাধারণ চিত্র, বর্ষাতে ছিল অন্য হিসেব। ৯০ এর এমন দিনে কি না একদিন বৃষ্টিতে আটকা পড়ি এই আক্তাপাড়াতে, একটা টঙ্গী দোকানে আশ্রয় নেই। সেখানে আমি প্রথম দেখি ফকির সমছুলকে, চা খাওয়া হয়, এটাসেটা কথা হয়। তখন ছিল আমার বাড়ি ফেরার তাড়া। তাই এমন বিপদে মনে পড়ে সাহস দিয়েছিলেন সমছুল ভাই। তাঁর সাথে অবশ্য ঘনিষ্ঠ হই আরও পরের দিকে। একবার এই কবছর আগে জগন্নাথপুর টিডিসি হলে রাধারমণ নিয়ে একটা আলোচনাসভায় আমরা অতিথি হই, অনুষ্ঠান শেষে আয়োজনকারীরা আমাদেরকে তাঁদের উদ্যোগে বাড়িতেও পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সমস্যা হলো আক্তাপাড়ার পাশে বয়ে চলা মহাসিং, রাতে সে নৌকা কোথায় যে সমছুল ভাই ধরাধরপুর যাবেন! আমি তাঁকে বলি, চিন্তার কারণ নেই, কষ্ট না নিলে এই রাতটা আমার এখানে কাটাতে পারেন। তিনি রাজি হলেন, আমরা রাত ২টার দিকে শান্তিগঞ্জ আসি; বাকী কিছুটা সময় আলাপ করে ঘুমাতে যাই। আমার পিতার ছিল সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠার অভ্যাস, সমছুল ভাইও মনে হয় এদিকে কম যেতেন না। তাই আমি যখন জেগে উঠি, দেখি তাঁদের দুজনের মধ্যে কী স্বছন্দ একটা আলাপের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে! পরবর্তীতে এটাও দেখেছি তাঁদের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কখনও কিছু ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে এদিকে আসতেন সমছুল ভাই, সবসময় সময় দেওয়া সম্ভব হতো না; এই সময়টাতে কি না আব্বা ও তিনি নিজেদের আলাপে মগ্ন হতেন।

এখানে এটা বলি, কখনও আমরা বন্ধুরা মিলে বসিয়ে ফেলতাম গানের আসর, সেটা হতো অনেক সময় হ্যাচারীতে। এখানে একজন দাঁড়িওয়ালা মখলিস ভাই ছিলেন বড় সহায়; তুলনাহীন সমঝদারিত্বের এক মানুষ। আমরা এখানে এই আয়োজনের ফাঁকে তখন রাতের খাবারও খেয়ে নিতাম, কয়েস আমাদের লাল চা খাওয়াতে ভুলতো না, আজিম ভাই ও একজন ইসমাইল ভাই থাকতেন না তা নয়। এখানে ফকির সমছুল ভাই থাকতেন, আসতেন বাউল উদাসী ভাইও। কখনও শেখ লুৎফর, ইমামুল রানারা ও জেলা শহর থেকে আসতেন কেউ কেউ। পাগলার আকমল ভাই গীটার এখানে বাজাতেন, শম্ভু বাবুর উপস্থিতি ছিল বাউলিয়ানাপূর্ণ ও আন্তরিক; লালও গাইতো তখন করিম শাহ’র গান। মঞ্জিল ভাই তো বটে, রাজীব ভাইয়েরাও তখন এসব মিস করতেন না; আসতেন নজিবুর ভাই ও অন্যেরা। সব মিলিয়ে সে রাতটা হতো আমাদের লোকগান- বাউল গান ও বাউলিয়ানার। এখানে আমরা অতীতের প্রতিচিত্র আর কী পেতে পারি?
বলি- সেখানে আবার সমছুল ভাইয়ের কথা আমাদের স্মরণ করতে হবে। এটা হলো আসলে একটা টেক্সট বা বয়ানের প্রশ্ন। তবে কাজটা হবে অধিকতর যোগ্য কোনও লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞের মানতে হবে। তাহলে এখন ফকির সমছুলের যে কাজ- ‘আশিকের রত্ন সমগ্র’ আমরা আপাত হাতের কাছে রাখতে পারি। আমরা দেখবো ফকির সমছুল তাঁর মরমি ভাব ও ভাষ্যে, সে মানুষ ও তাঁর নিবেদিত গানে যে শব্দ ব্যবহার করে গেছেন, এখানে তাঁর পূর্বসূরির চিহ্ন সামান্য নয় এবং এতদঞ্চলের লোকজীবনের প্রতিফলন ও মর্মবস্তুতে রয়ে গেছে একই। বলা বাহুল্য এটা হলো বাংলার ও তার বাউলের একমাত্র নিজস্ব জিনিস।

এবার এখানে আমরা ফকির সমছুলের দুটি গান তুলি দিচ্ছি। উল্লেখ যে, এই দুটি আমাদের আড্ডাগুলোতে তাঁকে কয়েকবার গাইতে শুনেছিলাম। এটা ধরে নেওয়া যায়, এই দুটি ছিল তাঁর বেশ প্রিয়। গান দুটি হলো-
১.
মাসিং নদী নে এত সুন্দর তোমার জল।
তোমার রাঙা জলে, স্নান করিলে, তাপিত প্রাণ হয় শীতল।।
সকাল সন্ধ্যা দুপুর বেলা, নৌকা চালায় মাঝি-মাল্লা।
গান গাইয়া সাধের বাউলা, করে উজান-ভাটি চলাচল।।
ধর্ম তোমার ভাঙা-গড়া, জল চলে উদ্দেশ্য ছাড়া।
আজকে নদী কাল ভরা, করিতেছ রদবদল।।
তোমার কূলে দিবানিশি, মন সাধে বাজাই বাঁশি।
তোমায় মায়ের মতন ভালবাসি, বলে সমছুল পাগল।।

২.
বন্ধু নিবেদি তোমায়, তুমি কি জান না বন্ধুরে, আমার কী সুখে দিন যায়।।
শান্তপুরে থাক তুমি রে ও বন্ধু সুখেরই আশায়।
বাতাসে নাসিকা রাখি তোমার গন্ধ নি পাওয়া যায়।। ও বন্ধুরে
আতর গোলাপ চূয়া-চন্দন রে ও বন্ধু রাখলাম কোটরায়।
মনসাধে ছিটাইলাম না তোমার রাঙা পায়।। ও বন্ধুরে
প্রেম অনল হইয়া প্রবল রে ও বন্ধু জ্বলে সর্বদায়।
যে আগুন ছাপাইয়া রাখছি, আমারও হিয়ায়।। ও বন্ধুরে
অধৈর্য্য হইয়াছি আমি রে, ও বন্ধু করি কী উপায়।
কয় সমছুল মরণকালে, দেখানি দিবায়।। ও বন্ধুরে
পরিশেষে বলতে হয় ফকির সমছুল ছিলেন সে মহত্তম সৃজনী বাঙালির একজন যে সাধারণের লোকভাষ্য তাঁর রচিত গানে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। এখন চাইলে- যদি অকৃতজ্ঞ না হই, তাঁর সে গান এবং এই ভাবসাগরে আমরা মাঝেমধ্যে অবগাহন করতে পারি।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে চোখ রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরণের আরও সংবাদ
themesba-lates1749691102