◑শেখ একেএম জাকারিয়া

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতি বছরই চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবনে এক স্থায়ী আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। আকাশে মেঘ জমলেই এখন অনেকের মনে অজানা ভয় কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়ছে, যার কারণে বজ্রঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভৌগোলিক দিক থেকেও হাওর অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। বিস্তীর্ণ জলাভূমি, নিচু ভূমি ও খোলা প্রান্তর বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাও ঝুঁকির একটি বড় কারণ। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জীবিকার কারণে অধিকাংশ মানুষকে দীর্ঘ সময় খোলা মাঠ বা হাওরে কাজ করতে হয়। হঠাৎ বজ্রপাত হলে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। অনেক সময় বজ্রপাতের পূর্বাভাস থাকলেও তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে বা কী ধরনের আচরণ নিরাপদ, এসব বিষয়ে অনেকেই যথেষ্ট অবগত নন। গাছের নিচে দাঁড়ানো, খোলা মাঠে অবস্থান করা বা ঝড়ের সময় পানিতে থাকা-এসব ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এখনও অনেকের মধ্যে দেখা যায়, যা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই দ্রুত পাকা ঘর বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া উচিত। খোলা মাঠ, হাওর বা উঁচু স্থানে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় ধাতব বস্তু ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকা নিরাপদ। বাইরে আটকা পড়লে মাটিতে শুয়ে না পড়ে শরীর ছোট করে নিচু হয়ে বসে থাকা উত্তম। একই সঙ্গে দলবদ্ধভাবে না থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলে ঝুঁকি কমে।
গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিন ধরে রহস্যময় পিলার নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, এসব পিলারের সঙ্গে অদ্ভুত শক্তি বা গুপ্তধনের সম্পর্ক আছে। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়ও এ ধরনের পিলার নিয়ে নানা কাহিনি শোনা যায়। কেউ বলতেন, ওই পিলারের কাছে গেলে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে, আবার কেউ বিশ্বাস করতেন সেখানে লুকিয়ে আছে বিপুল সম্পদ।
তবে ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে এসব পিলার মূলত ভূমির সীমানা নির্ধারণের জন্য বসানো হয়েছিল। এগুলো প্রশাসনিক জরিপের অংশ ছিল, কোনো গুপ্তধন বা অলৌকিক শক্তির উৎস নয়। ধাতব উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়ায় এগুলো বিদ্যুৎ পরিবাহী হতে পারে, তবে এগুলোকে পরিকল্পিত বজ্রনিরোধক হিসেবে ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তবুও স্থানীয়ভাবে একটি ধারণা প্রচলিত যে, এসব পিলার হারিয়ে যাওয়ার পর বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর পেছনে সরাসরি পিলারের ভূমিকা না থাকলেও পরিবেশগত পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। আগে গ্রামাঞ্চলে বড় গাছপালা বেশি ছিল, যা বজ্রপাতের আঘাত আংশিকভাবে শোষণ করত। বর্তমানে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে যাওয়ায় মানুষ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। হাওর এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, গ্রামাঞ্চলে আধুনিক বজ্রনিরোধক স্থাপন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
এ ছাড়া গণসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে মানুষকে জানাতে পারলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
প্রকৃতির এই অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে থামানো সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। সুনামগঞ্জের প্রেক্ষাপটে এটি এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং একটি মানবিক সংকট, যার সমাধানে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্মিলিত উদ্যোগ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সভাপতি- সুনামগঞ্জ সাহিত্য সংসদ ও গণপাঠাগার।