☞ শেখ একেএম জাকারিয়া

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল প্রকৃতির অনন্য রূপমালা, আর এই ভূপ্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী, খাল ও হাওরের নাম। এসব নাম কেবল ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং লোকবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের মিলিত প্রতিচ্ছবি। সুনামগঞ্জ জেলার ইসলামপুর গ্রামে এমন দুটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, “সাপের দাড়া” খাল এবং “শিয়াল মারা” হাওর। এ দুটি নামের ভেতরে যেমন আছে ভূপ্রকৃতির প্রতিচ্ছবি, তেমনি আছে ইতিহাস ও লোকজ স্মৃতির দাগ।

ইসলামপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী একটি খাল হলো “সাপের দাড়া”। স্থানীয়দের কেউ একে “হাফের ধারা” বলেও উচ্চারণ করেন। প্রবীণদের মতে, খালটির প্রবাহ সাপের মতো আঁকাবাঁকা ও সর্পিল হয়ে হাওরের বুকে গিয়ে মিলেছে। এই সর্পিল আকৃতিই নামের উৎস, “সাপের দাড়া”। সময়ের সাথে সাথে এ নাম সরকারি নথিপত্রেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতিবছর খালটি ইজারা দেওয়া হয়, স্থানীয় ইজারাদাররা প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে লিজ নিয়ে মাছ আহরণ করেন। বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানি বেড়ে গেলে দেশি মাছের অফুরন্ত প্রাচুর্যে ভরে ওঠে এই খাল। ফলে এটি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবিকারও প্রধান অবলম্বন। নামতত্ত্বের বিচারে “সাপ” অংশটি আঁকাবাঁকা আকৃতির প্রতিফলন, আর “ধারা” শব্দটি স্থানীয় উপভাষায় খাল বা জলধারা বোঝাতে ব্যবহৃত। উচ্চারণের ভিন্নতায় “ধারা” ক্রমে “দাড়া” রূপে প্রচলিত হয়েছে।

অন্যদিকে, ইসলামপুর থেকে গোয়ারছড়া যাওয়ার পথে সড়কের বাঁ পাশে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ হাওরের নাম “শিয়াল মারা”। আঞ্চলিক উচ্চারণে কেউ কেউ একে “হিয়াল মারা”ও বলেন। এই হাওর কৃষি ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রধান জীবিকা। প্রবীণদের বয়ানে জানা যায়, এক সময় হাওরটি ঘন বনজঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে আচ্ছন্ন ছিল। সেখানে শিয়াল ও শুকরের আধিক্য ছিল প্রবল। শীতকালে জমি আবাদযোগ্য করার জন্য এলাকাবাসী বনজঙ্গল পরিষ্কার করতে গেলে শিয়াল-শুকর নিধন করতে হতো। এ ঘটনা বারবার ঘটতে থাকায় হাওরটির নাম দাঁড়ায় “শিয়াল মারা”। পরবর্তীতে এ নামও সরকারি নথিপত্রে স্থায়ী রূপ লাভ করে। নামতত্ত্ব অনুসারে “শিয়াল” অংশটি এককালে শিয়ালের আধিক্যকে বোঝায় এবং “মারা” অংশটি আবাদযোগ্য ভূমি সৃষ্টির জন্য প্রাণী নিধনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে প্রতিফলিত করে। আবার আঞ্চলিক উপভাষার প্রভাবে “শিয়াল” শব্দটি অনেকের মুখে “হিয়াল” আকারে প্রচলিত হয়েছে।

“সাপের দাড়া” খাল ও “শিয়াল মারা” হাওরের নামকরণে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা নিছক ভৌগোলিক নাম নয়; বরং সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পরিবেশ, জীবিকা, ইতিহাস ও লোকস্মৃতির সম্মিলিত নিদর্শন। এই নামগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। তাই এগুলো সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

তথ্যসূত্র

১. ইসলামপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের মৌখিক সাক্ষাৎকার।
২. স্থানীয় ইজারাদার ও মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতা।
৩. স্থানীয় কৃষক ও প্রবীণ ব্যক্তিদের মৌখিক বর্ণনা।
৪. সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চল বিষয়ক মাঠ জরিপ ও লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি।
৫. তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা : দৈনিক সুনাম দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক রাহমান তৈয়ব।