শেখ একেএম জাকারিয়া

আমরা সবাই জানি বাংলা বারো মাসের নাম—বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি—এই মাসগুলোর এমন নামকরণ কীভাবে হলো? বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ—এই শব্দগুলো এলো কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা কেবল কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়, বরং তা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক অনন্য অংশ।

বাংলা মাসগুলোর নামের উৎস খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সংস্কৃত সাহিত্যে। এ নামগুলো মূলত সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত এবং সূর্য যখন যেসব নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করে, সেই নক্ষত্রগুলোর নাম থেকেই এসব মাসের নামকরণ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, সম্রাট আকবর শস্য উৎপাদন ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বছরের ভিত্তিতে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এই নতুন ক্যালেন্ডারটি পরিচিতি পায় ‘ফসলি সন’ নামে, যা পরবর্তীতে ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ নামে পরিচিত হয়। আকবরের আদেশে এই সৌর পঞ্জিকা প্রস্তুত করেন তৎকালীন খ্যাতিমান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত ফতেহউল্লাহ সিরাজী। তিনি মাসগুলোর নাম নির্ধারণে অনুসরণ করেন প্রাচীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ সূর্যসিদ্ধান্ত।

সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে, সূর্য যখন যেসব নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করে, সেইসব নক্ষত্রের নাম অনুসারে বাংলা মাসগুলোর নামকরণ হয়। প্রায় ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে থেকে সূর্য কোন সময় কোন নক্ষত্র অঞ্চলে থাকে, তার ওপর ভিত্তি করে বেছে নেওয়া হয়েছে বারোটি মাসের নাম।

আসুন, জেনে নিই কীভাবে এবং কোন কোন নক্ষত্র থেকে এলো বাংলা মাসের নামগুলো—

বৈশাখ
বাংলা বছরের প্রথম মাস। গ্রীষ্মের সূচনা ঘটে এই মাসে। ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে ‘বৈশাখ’। এই সময়ে সূর্য থাকে বিশাখা নক্ষত্রের কাছাকাছি।

জ্যৈষ্ঠ
দ্বিতীয় মাস এবং বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। ‘জ্যেষ্ঠা’ নক্ষত্র থেকে এসেছে এই নাম। এ সময় সূর্য জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের সন্নিকটে অবস্থান করে।

আষাঢ়
বর্ষাকালের সূচনা হয় এই মাসে। ‘পূর্বাষাঢ়া’ নামক নক্ষত্র থেকে এসেছে ‘আষাঢ়’। সূর্য এই সময়ে আষাঢ়া নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকে।

শ্রাবণ
বর্ষার দ্বিতীয় মাস, প্রবল বৃষ্টির সময়। ‘শ্রবণা’ নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে ‘শ্রাবণ’।

ভাদ্র
বর্ষার শেষ এবং শরৎকালের শুরু। ‘পূর্ব ভাদ্রপদ’ ও ‘উত্তর ভাদ্রপদ’ নামক নক্ষত্র থেকে এসেছে এই মাসের নাম।

আশ্বিন
শরতের পূর্ণতা আসে এই মাসে। ‘অশ্বিনী’ নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে ‘আশ্বিন’ মাসের নাম। সূর্য এই সময়ে ‘অশ্বিনী’ নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করে।

কার্তিক
হেমন্তের শুরু। ‘কৃত্তিকা’ নক্ষত্র থেকে এসেছে ‘কার্তিক’ নাম।

অগ্রহায়ণ
হেমন্তের দ্বিতীয় মাস। শীতের আগমন ঘটে। ‘মৃগশিরা’ নক্ষত্র থেকে এসেছে ‘অগ্রহায়ণ’ নাম।

পৌষ
শীতের প্রকোপ শুরু হয় এই মাসে। ‘পুষ্যা’ নক্ষত্রের নামানুসারে এ মাসের নাম ‘পৌষ’।

মাঘ
শীতের শেষ মাস। ‘মঘা’ নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে ‘মাঘ’। এই সময়ে শীত তীব্র থাকে।

ফাল্গুন
বসন্তের শুরু হয় ফাল্গুনে। ‘উত্তর ফল্গুনী’ ও ‘পূর্ব ফল্গুনী’ নামক নক্ষত্র থেকে এসেছে এই নাম।

চৈত্র
বছরের শেষ মাস এবং বসন্তের অন্তিম কাল। ‘চিত্রা’ নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে ‘চৈত্র’। এই সময় গ্রীষ্মের আগমন ঘটে।

বাংলা মাসগুলোর এই নামকরণ কেবল সময় গণনার জন্য নয়—এর পেছনে রয়েছে এক সমৃদ্ধ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং প্রকৃতি, কৃষি, ঋতুচক্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক গভীর সংযোগ। প্রতিটি মাসের নাম আমাদের চিরায়ত কৃষিনির্ভর জীবনধারা, ঋতু পরিবর্তনের সৌন্দর্য ও প্রাচীন জ্ঞানচর্চার সাক্ষ্য দেয়।

আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ক্যালেন্ডারের এই বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাটা কেবল দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের জাতিসত্তার প্রতি এক গর্বময় সম্মানও।

লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক।