◑ নার্গিস পারভীন,কলকাতা::

আমরা বাইরে থেকে যা চাক্ষুষ দেখি, তার কি সবই ঠিক দেখি? চকচক করলেই যে সোনা হয় না তার প্রমাণ এই গল্পটি। শুধু একদিনের ঘটনা তুলে ধরা হলো–

হেমন্তপুর গ্রামে বাস করতেন এক দম্পতি। বেশ সুখ ও স্বচ্ছলতার বেশ চকচকে পরিবার তাঁদের। গ্রামের মানুষজন তাদের বেশ সমীহ ও করতো। কারণ তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, শিক্ষিত এবং মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার তারা উভয়ই বজায় রাখতেন। দান দয়া থেকে শুরু করে মানুষের বিপদে পাশে থাকতে তারা পিছপা হতেন না তাঁরা। বাড়িতে আত্মীয় বা প্রতিবেশী আসলে তাদের সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ ও সুন্দর আপ্যায়নে সবাই বেশ খুশিই হতো। এমন সুন্দর সাজানো-গোছানো একটা পরিবার দেখে অনেকেই যে ইর্ষা বা হিংসা করতো না তা কিন্তু নয়।

একদিন হঠাৎ বাড়ির বউটি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এবারে ও তার স্বামী তার অসুস্থতার কথা কিছুই জানলেন না। কয়েকদিন এভাবেই চলতে থাকার পর স্ত্রী তার স্বামীকে জানালেন শরীর খারাপ, ডাক্তার দেখাতে হবে। স্বামী ডাক্তার দেখানোর টাকা দিয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে গেলেন। স্ত্রী ঘরের কাজ সামলে যথাসময়ে ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তার ও যথারীতি ঔষধ লিখে দিলেন। স্ত্রী স্বামীকে ফোন করে জানালেন ‘ঔষধ কিনতে হবে। কি করবো’? স্বামী বললেন, ‘প্রেসক্রিপশন এর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিও ঔষধ কিনে নিয়ে যাব’। সারাদিন না খেয়ে থাকা স্ত্রী বাড়িতে এসে দু’মুঠো খেয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুম থেকে উঠে ফোনে স্বামীকে ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘আমার ঔষধ নিয়েছো?’ স্বামী জবাব দিলেন, ‘রাত্রি আটটা হয়ে গেছে আজকে, আর ওষুধ কেনা সম্ভব নয়, কালকে দেখবো’। ফোন কেটে গেল। পরদিন সারাদিন ঔষধ এলো না। রাতে ফেরার সময় ঔষধ আনবেন এই আশায় দিন কাটলো তাঁর। সন্ধ্যার কিছু আগে তাঁর অসুস্থতা অনেকখানি বেড়ে গেল। তখনো কাউকে কিছু বলতে পারলেন না তিনি। স্বামী ও জানতে চাননি তার কি সমস্যা হচ্ছে বা কি ঔষধ লিখেছেন ডাক্তার। কোনমতে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে করতে একসময় বউটি ঝিমিয়ে গেলেন। বাড়ি থেকে ফোন গেল মেয়ের, ‘বাবা তাড়াতাড়ি এসো, মায়ের খুব শরীর খারাপ। ঔষধ নিয়ে এসো’। জবাব এলো –’রাতে ফেরার সময় ঔষধ নিয়ে আসব। এখন ঘরে কিছু ঔষধ থাকলে আপাতত খেতে বলো’। এ কথা শুনে বৌয়ের চোখ দুটি ভিজে গেল ঠিকই কিন্তু কোন কথা না বলে চুপ থাকলেন।

সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে আবার ফোন গেল–’বাবা মা কোন কথা বলছে না, কেমন যেন হয়ে গেছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো–’
বাবা জবাব দিলেন, ‘কাজের চাপে আছি। কাজ শেষ করে যাচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করোনা। তোমরা পাশে থাকো’।
কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর মেয়ের ফোন পৌঁছালো কিন্তু বাবা এলেন নয়টায়। তখন রোগীর চোখ দুটো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তড়িঘড়ি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার জবাব দিলেন, ‘সরি, সী ইজ এক্সপায়ার্ড। বড্ড দেরি হয়ে করে ফেলেছেন’। স্বামী স্ত্রীর বডি জড়িয়ে প্রচন্ড শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলেন। সবাই তখন মৃত দেহ ফেলে স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। কেউ কেউ বলল, ‘স্বামীর চোখের জল নিয়ে যাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার বৈকি!’ কেউ বলল, ‘ আহা! কতো সুখের সংসার ছিল গো ওদের। ভাগ্যে সুখ সইলো না’। কেউ বললেন, ‘আহা বউটি বড় ভালো মানুষ ছিল’। কেউ বাচ্চা দুটোর কথা ভেবে আফসোস করে কেঁদেও ফেললো। কেউ বলল, ‘ স্বামীটি এ শোক কিভাবে যে সামলে উঠবে? তা একমাত্র উপরওয়ালা ই জানেন ।’ স্বামীটি বারবার কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলেন, ‘ডাক্তারবাবু আপনার দুটো পায়ে পড়ি, আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিন। আমি যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ওকে ফিরে পেতে চাই।’

একথা শুনে পাশে থাকা পুরুষ মহিলারা সাব্বাস দিলো ঐ স্বামীকে। আর কান্না ভেজা গলায় সমস্বরে তাঁরা বলল, “সত্যিই মেয়েটি ভাগ্যবতী। এমন স্বামী কয়জনের ভাগ্যে জোটে?’

এভাবে কান্নায় আর প্রশংসায় অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেল। তাঁর রক্তের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার যে ঔষধ লিখেছিলেন তা আর কিনতে হলো না। পাঠককে অবগত করছি যে, এই লেখাটি ছিল মেয়েটির দীর্ঘ কুড়ি বছরের লড়াইয়ের শেষ দিনের ঘটনা। যেদিন সব অভিমান অভিযোগ এক নিমেষে স্বামীর বুকফাটা কান্নায় চাপা পড়ে গেল চিরদিনের মতো। যার বারবার এভাবে বাঁচার লড়াই করতে করতে একদিন হেরে যেতে হলো জীবনের কাছে। এমন বহু ঘটনার সাক্ষী হারা হয়ে গেল একটি অসমাপ্ত জীবনের শেষ পরিণতি। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের ভাষায়, স্বামী রেখে স্বামীর কোলে মৃত্যু মানে সাক্ষাৎ স্বর্গে আরোহন। যা নাকি সবার ভাগ্যে জোটে না। স্বামীর অশ্রু নিয়ে যেতে পারাটাও সত্যিই একটা মেয়ের জন্য অনেক ভাগ্যের ব্যাপার!!

লেখক: সোশ্যাল এক্টিভিস্ট,বহুগ্রন্থপ্রণেতা ও ইনফ্লুয়েন্সার