আশ্রাফুল আলম মোঃ নুরুল হুদা
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
বড়দল উচ্চ বিদ্যালয়,তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।
আমরা মানুষ। যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলে সামাজিক জীব। আমাদের চলন-বলন,উঠা-বসা সবকিছুই চিরচেনা এ সমাজকে ঘিরে।
পরিবারের গন্ডি পেরিয়েই সমাজ নামক নতুন মেরুর সীমা। সকাল-সন্ধ্যা প্রতিটি মানুষ নানা কাজে, নানা বিষয়ে একে অন্যের সাথে নানাভাবে বন্ধন তৈরী করে। এতে থাকে সকলেরই নিজ, নিজ স্বার্থ ও সুবিধার কৌশলগত চিন্তা। এরমধ্যে কেউ সমাজের ভালো মন্দের বিষয়েও এগিয়ে থাকে। যা বসতিদের জীবনমানে গেটাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
এতে নিজ কাজে সফলতায় যেমন বেগ পেতে হয়, তেমনি সমাজের কাজেও সফলতা পেতে বেগ পাওয়া খুবই পরিচিত বিষয়। তবে সত্য,সুন্দর, ও ন্যায় সঙ্গত কাজে অসুস্থ সমালোচনাকে সুশীলেরা পাত্তা দেয়না। কারণ এটা এক ধরনের দূষিত আবহাওয়া। যা সমাজে ছিল, আছে এবং থাকবে। এগুলোকে জেনেশুনেই রেডমার্ক করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।ধর্মীয় কিতাব মহাগ্রন্থ আল-কোরআন, রাসুলের সুন্নাহ আল হাদীসে এ ব্যাপারে অনেক উত্তম সবক আমরা পাই।
কোরআনে আমাদের যোগ্যতার বর্ণনায় বলা হয়েছে
كنتم خير امه اخرجت للناس تامرون بالمعروف وتنحونا عن المنكر
তোমাদেরকে মানুষের মধ্য হতে উত্তম জাতি হিসাবে বের করা হয়েছে যেন তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজের নিষেধ দাও।
পরিচয়ে আমরা পরিষ্কার বুঝলাম আমরা শ্রেষ্ঠ।
আমাদের কাজ ভালো দিকে নিজে হাঁটা এবং অন্যকেও হাটার পরামর্শ সহ মন্দ থেকে ফিরিয়ে রাখা।
রাসুলের হাদিসে ও বলা হয়েছে
المسلم اخو المسلم
এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই।
মায়ের ঔরসজাত সন্তান যেভাবে ভাই,ভাই হিসাবে পরিচয়ে অনেক গুরুত্ব ও দায়িত্ব রাখে তদ্রুপ, যত অপরিচিত যত দূর-দূরান্তই হোক সে যদি মুসলিম হয় তাহলে ধর্মীয় রীতিতে সে তার ভাই। তাই তার গুরুত্ব ও দায়িত্ব তার ভাইয়ের মতই হতে হবে। এতে কম-বেশ করার কোন সুযোগ নেই।
ব্যাপারটিকে আরেক হাদিসে রাসুল (সাঃ)আরো গুরুত্ব প্রকাশ করে বলেন
من احب لله وابغض لله واعطى لله ومنع لله فقد استكمل الايمان
যদি কেহ কাউকে ভালবাসে সে যেন আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালবাসে, কাউকে ঘৃণা করে আল্লাহর উদ্দেশ্যই ঘৃণা করে,
কাউকে কোন কিছু দান করে তা আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করে, আর যদি দান থেকে বিরত থাকে তাও আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বিরত থাকে, তাহলেই তার ঈমানের পূর্ণতা পেল।
বুঝা গেল মুসলিম হিসাবে অন্তর্ভুক্তি বা মুসলিমের জাতে যারা তালিকাভূক্ত তাদের প্রতিটা কর্মই হবে আল্লাহর কৃপা,দয়া তথা সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়।
রবের দয়ার প্রত্যাশা যেখানে বিদ্যমান সেখানে তার প্রতিটা পদক্ষেপ নির্ভেজাল থাকবে বলেই সকলের শক্ত ধারনা।
ফলে ব্যক্তির
নিজ-পর, সমাজ সহ কোন কাজে কারো চোখে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই।
মুসলিম জাতিকে সততা,ন্যায়,ন্যায্যতা,ভ্রাতৃত্বের সুমহান প্রশিক্ষণে ডেক্সে আনতে গিয়ে মহান রব তাঁর প্রিয় রাসুলের মাধ্যমে নামাজের মত উপহার
পাঠিয়েছেন।
নামাজ আমাকে কী দেয়?
নামাজ ধনী- গরীব ভেদাভেদ মাটিতে লুটায়, নামাজ দিনে ৫ বার আমাদের একত্রিত করে।
নামাজ একে- অন্যের সাথে কুশল বিনিময়ের সুযোগ করে, সুখ-দুঃখ শেয়ার করার এ এক অবারিত সুযোগ।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরীর এক মহা দিগন্ত।
বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞানীরাও এর অনেক শারীরিক সুফল বয়ান করেন।
আর মহান রব অন্য জায়গায় তাঁর প্রদত্ত উপহারের বয়ান দিতে গিয়ে বলেন
ان الصلاه تنهى عن الفحشاي والمنكر
নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে খারাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।
একজন মানুষ যখন দিনে ৫ বার শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে নামাজ আদায় করে সে আর পাপ বা অন্যায় কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়না।
আমরা শিখেছি সাতদিনে এক সপ্তাহ। দিনগুলো আপনার আমার সামনে বিনাবাধায় বিরামহীন ভাবে ঘুরতেছে। সাতটি নাম নিয়ে। এতে তাদের ছুটি বা কোন অজুহাত প্রকাশের স্পর্ধা নেই।
ধর্মীয় রীতিতেই বলা হয় শুক্রবারকে
سيد الايام
দিনসমূহের সর্দার।
আবার হাদিসে এও বলা হয়
الجمعه في حج المساكن
জুমার (শুক্রবার) নামাজকে মিছকীনদের হজ্ব বলা হয়।
حج
এটা সামর্থ্যবানদের উপর শরয়ী গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদাত। যা একজন অসহায় গরীব মিছকীনের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিধায়, প্রত্যেক শুক্রবারে সত্যিকারভাবে শরয়ী নীতিমালায় একজন গরীব, মিছকীন খুলুসিয়াতের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে জুমার নামাজ আদায় করে
মহান রব তাঁর প্রতি অনুগ্রহের ভান্ডার খুলেও দিতে পারেন। যা নিতান্তই রবের ইচ্ছার উপর।
রব তাঁর গোলামের প্রতি কিভাবে সুবিচার ও সহমতের পয়গাম দিয়েছেন তার চকচকে আলামত রোযা নামক আরেকটি ফরজের দিকে থাকালেই হয়।
বিত্তবান সারাবছর তার অর্থের বড়াই হিসাবে নিজের রুচির গোলামীতে মগ্ন। অপরদিকে তার নিকটেই অন্যকেউ দিনের পর দিন,রাতের পর রাত অনাহারে-অর্ধাহারে দিন- রাত ধৈর্য্য ধরছে।
এ কষ্ট, বেদনা ও উপবাসের যন্ত্রণা পরিষ্কার বুঝতে বৎসরে টানা ০১ মাস রোযার ব্যবস্হা করেছেন। মাসটির বরকতময় আরবি নাম রমজান।
এতে বিত্তশালীরা উপবাসের যন্ত্রণা শেখার সুযোগ পায়। পাশাপাশি গরীবের প্রতি সহানুভূতির মন-মেজাজ তৈরী হয়। রোযা শেষে খোলা মাঠে ধনী-গরীব মিলে- মিশে একাকার হয়ে রবের কুূদরতী পায়ে লুটিয়ে পড়ে।
নামাজ শেষে শুরু হয় কুশলাদি, আলিঙ্গন, বেড়ানোর নিমন্ত্রণ। মহা-আনন্দের পরিচ্ছন্ন স্রোত।
রমজান বিদায়ের কিছুদিন পরই মুসলিম জনগোষ্ঠী গগনপানে থাকায়, আর খুঁজতে থাকে ক্যালেন্ডারের তারিখ। যার চেয়ারে বসা জিলহজ্জ মাসের চাঁদ। আমাদের ধর্মীয় পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুত্র হজরত ইসমাঈল (আঃ) এর স্বপ্নের সাহসিকতাপূর্ণ পরিক্ষার পর বাবা -ছেলে উভয়ই তাদের পরিক্ষায় সর্বোচ্চ ঈমানী সফলতায় কামিয়াব হন। যা সুন্নাত হিসাবে আমাদের মুসলিম সমাজে বছরে একবার দেখা দেয়।
জিলহজ্ব মাসে মুসলমানরা সামর্থ্য বিবেচনায় কুরবানির প্রস্তুতি নেয়। যা নিতান্তই মহান রবের সন্তুষ্টির নিমিত্তে।
এতে সমাজ যে বিষয়ের গুরুত্ব পায়। তা হল সহমর্মিতা, সহযোগিতা আর নিজেকে ত্যাগের ও উদারতার জায়গায় পরিবর্তন করা।
খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায়ের পর শুরু হয়
কোলাকুলি, কুশলাদি বিনিময়, আর কুরবানির পশু জবাইয়ের ব্যস্হতা।
জবাই কাজ শেষে সবাই নিজ,নিজ আত্বীয়-স্বজন,পাড়া -পড়শি সহ ও অসহায় এতিম,মিছকীন ও গরীবদের মাঝে মাংশ বিতরণ করতে থাকে। শুরু হয় মনখোলা আনন্দ ও খুশীর বন্যা। পাড়ায় এমন কোন ঘর নাই যে ঘরে আনন্দের ঢেউ লাগেনি। সকলের ঘরেই আজ গোস্তের তরকারি। এ এক বিরাট সম্প্রীতির নিরব আওয়াজ। যা দুনিয়ার মানুষকে ত্যাগের সবকই দেয়না, সবক দেয় আখেরাত তৈরিতে নৈতিক শিক্ষার।
মুসলিম সমাজের এ দুটি মহা আনন্দের নাম রমজান শেষে খোলা মাঠে নামাজ মানে পবিত্র ঈদ উল ফিতর।
আরেকটি জিলহজ্জ মাসের কুরবানির ঈদ তথা ঈদ উল আজহা ।
যাকে আমরা সচরাচর সহজ বাংলায় বলে থাকি রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদ।
ঈদ আমাদের শিখায় বিগত সকল হিংশা-বিদ্বেষ,
অহমিকা ও শত্রুতা পরিহার করে বন্ধুত্বের বন্ধনে সকলে মিলেমিশে আখেরাতমূখী মনোভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য তৈরী করা।
কিন্তু আসলে কী আমরা নিজেকে ইসলাম, কোরআন ও হাদীসের রঙে রঙ্গিন করেছি?
নামাজ, শুক্রবার,,রোযা,কোরবানী তথা দুই ঈদ আমাদের ধাপে, ধাপে নৈতিক, আচরণিক ও আখেরাতমূখী শিক্ষার ইশতেহার দিয়ে চলছে।
আমরা বসছি,শুনছি,দেখছি পড়ছি, লোক সমক্ষে বলছি। এ পর্যন্তই আমাদের সীমানার গন্ডি। না বাস্তবে
ন্যায্যতা,শরিয়াত, আদেশ,ও কথা-কাজের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে নিজের চরিত্র গঠনের কাজ করছি।
যদি পরিবর্তনের ইস্পাত কঠিন আখেরাতমূখী আমলের কাজ আমরা করতাম তাহলে অনেকেই মসজিদ থেকে বের হয়ে, শুক্রবারে নামাজ শেষে, ঈদের সালাত শেষে, পুরুমাস সাওম সাধনা ও কোরবানী আদায়ের পর কীভাবে দুর্গন্ধ মিথ্যার সাথে সখ্যতা গড়ি। কীভাবে অন্যের হক কৌশলে মারার চেষ্টা করি, কীভাবে রসালাপের মাধ্যমে অন্যের চরিত্র হনন করি। কীভাবে ব্যবসায় বেজাল সৃষ্টি করি, কীভাবে পরিবারে,পাড়ায়,মহল্লায়, তথা এলাকায় বাজে কথা, বাজে কাজ সহ ঝগড়ার অপ কৌশলের বীজ বপন করি।
তাতো ইসলাম শেখায়নি বা কোরআন,হাদীস বলেনি!
তাহলে বাস্তবতা হল আমরা পরিবর্তন হইনি। আমরা ঈমানের পাল্লায় অযোগ্য। এহেন ঘৃণ্য অপকাজ পরিত্যাগ না করলে আমার ভালো কাজের চারা গাছটি বড়ও হবেনা ফলও ধরবেনা। বরং সঠিক ও সময়োপযোগী তত্ত্বাবধানের অভাবে এক সময় নিরবে বিদায় নিবে।
তাই আসুন, আমাদের সামনে পবিত্র ঈদ উল আজহা কড়া নাড়ছে।
ঈদ উল আজহাকে সামনে রেখে এক বাক্যে শপথ নেই
আমরা সকলেই পাপ ও সকল অন্যায়কে সত্যিকার অর্থে পাপ বলি ও মন থেকে ঘৃণা করি।
তা যতই দেখতে লোভনীয় লাভবান হউক না কেন। পাশাপাশি সকল কল্যাণমুখী আখেরাতের কাজে নিজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খারাপ থেকে বাঁচার ও ভালো কাজে শরীক হওয়ার তৌফিক দান করুন।